বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের অভিঘাত যখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে, তখন ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক জটিল সন্ধিক্ষণে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের তাগিদ; অন্যদিকে নদীদূষণ, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত জাতীয় জিডিপির প্রায় ২৮ শতাংশ জোগান দেয় এবং প্রায় ৭৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
অথচ প্রচলিত এই উৎপাদনের উল্টো পিঠে রয়েছে ভয়াবহ পরিবেশগত মূল্য; সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভয়াবহ বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর জিডিপির ১৭ দশমিক ৬ শতাংশেরও বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে এবং বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে। এই প্রেক্ষাপটে কেবল সনাতনী কার্বন-নির্ভর ব্যবসায়িক মডেলে আটকে থাকা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত-কোনো দিক থেকেই আর টেকসই নয়। পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের মেলবন্ধন ঘটাতে স্থানীয় পর্যায়ে সবুজ উদ্যোক্তা এবং পরিবেশবান্ধব স্টার্টআপের বিকাশ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সম্ভাবনার নবদিগন্ত: সবুজ উদ্যোক্তা ও সার্কুলার অর্থনীতি
সবুজ উদ্যোক্তা কোনো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার লোকদেখানো কর্মসূচি নয়; বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই কৃষি, শিল্পবর্জ্য পুনর্ব্যবহার, বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব ব্যবসা পরিচালনা করাই এর মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের তরুণ ও স্থানীয় উদ্ভাবকরা সীমিত সম্পদের মধ্যেও রুফটপ সোলার, কৃষি-বর্জ্য থেকে জৈবপণ্য তৈরি, ই-মোবিলিটি এবং পাট ও প্লাস্টিক বিকল্প প্যাকেজিং নিয়ে আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ গড়ে তুলছেন। গবেষণার উপাত্ত সাক্ষ্য দেয়, এসব সবুজ উদ্যোগ কেবল পরিবেশের দূষণই কমায় না, বরং টেকসই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও শোভন কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের বিশেষ করে সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানি (SDG 7), টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (SDG 8), টেকসই শিল্পায়ন ও উদ্ভাবন (SDG 9), দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন (SDG 12) এবং জলবায়ু কার্যক্রম (SDG 13) অর্জনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।
নীতির প্রতিশ্রুতি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বলিষ্ঠ উদ্যোগ
সবুজ রূপান্তরের এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে নীতিগত ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি দেখিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে ২০১১ সাল থেকেই টেকসই ব্যাংকিং ও সবুজ অর্থায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। পরবর্তীতে সমন্বিত 'সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স পলিসি' এবং সুনির্দিষ্ট 'গ্রিন টেক্সোনমি' প্রণয়ন করা হয়, যার আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তরল বর্জ্য শোধনাগার (ETP), বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব কারখানাসহ বিভিন্ন খাতের জন্য স্বল্পসুদে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম (Refinance Scheme) বরাদ্দ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট মেয়াদী ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ সবুজ ও টেকসই প্রকল্পে বিতরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে টেকসই অর্থায়নে নেতৃত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
মাঠের বাস্তবতা: অর্থায়নের কঠিন প্রাচীর
কাগজে-কলমে নীতির এই চমৎকার প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে যখন কোনো তরুণ উদ্যোক্তা একটি পরিবেশবান্ধব স্টার্টআপ বা সবুজ এসএমই প্রতিষ্ঠা করতে যান, তখন তিনি এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, সবুজ উদ্যোক্তা বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো টেকসই অর্থায়নের অপ্রতুলতা ও অর্থায়ন ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা।
১. জামানতের কঠিন শর্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনীহা: প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখনো প্রায় সম্পূর্ণভাবে স্থাবর সম্পত্তিভিত্তিক জামানতের (Collateral-based lending) ওপর নির্ভরশীল। অথচ অধিকাংশ তরুণ গ্রিন স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মেধা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর; তাদের ব্যাংকে বন্ধক রাখার মতো জমি বা ভবন থাকে না। ফলে ব্যাংকগুলোর কঠোর ঋণ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরুতেই তাদের বাতিল করে দেয়।
২. উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ ও 'পেশেন্ট ক্যাপিটাল'-এর অভাব: ক্লিন-টেক বা সবুজ প্রযুক্তির গবেষণা, প্রোটোটাইপিং ও প্ল্যান্ট স্থাপনে উচ্চ প্রাথমিক মূলধন (High upfront capital cost) প্রয়োজন হয় এবং বিনিয়োগ তুলে আনতে দীর্ঘ সময় (Long investment horizon) লাগে। প্রচলিত ব্যাংকগুলো যেখানে স্বল্পমেয়াদী নিশ্চিত রিটার্ন খোঁজে, সেখানে সবুজ উদ্ভাবকদের প্রয়োজন ‘পেশেন্ট ক্যাপিটাল’ (ধৈর্যশীল দীর্ঘমেয়াদী মূলধন), যার প্রাতিষ্ঠানিক সরবরাহ আমাদের অর্থবাজারে একেবারেই সীমিত।
৩. ব্যাংকগুলোর কারিগরি সক্ষমতা ও ঝুঁকি নিরূপণের ঘাটতি: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কর্মকর্তাদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব বা সার্কুলার প্রজেক্টের প্রযুক্তিগত উপযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ নগদপ্রবাহ মূল্যায়নের পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাব রয়েছে। ফলে অনেক লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পকেও ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ (High-risk) মনে করে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
৪. সুদের হার ও অতিরিক্ত অনুপালন ব্যয়: পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা থাকলেও দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, মধ্যবর্তী ব্যাংকিং মার্জিন এবং জটিল ডকুমেন্টেশনের কারণে উদ্যোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঋণের সুদের হার অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া পরিবেশগত লাইসেন্স ও একাধিক তদারকি সংস্থার অনুমোদন নিতে গিয়ে যে বাড়তি অনুপালন ব্যয় (Compliance cost) তৈরি হয়, তা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়।
প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা ও সুশাসনের সংকট
কেবল অর্থায়ন নয়, পরিবেশগত সুশাসনের (Environmental Governance) ঘাটতিও সবুজ অর্থায়নের সুফলকে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ব্যাপক অভাব রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিদর্শন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহায়ক না হয়ে নিয়ন্ত্রক ও হয়রানিমূলক রূপ নেয়। এর ফলে প্রকৃত সবুজ উদ্যোক্তারা অর্থায়ন ও আইনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে অস্বচ্ছতার সুযোগে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর 'গ্রিনওয়াশিং' (প্রকৃত পরিবেশবান্ধব না হয়েও পরিবেশের দোহাই দিয়ে সুবিধা নেওয়া)-এর ঝুঁকি তৈরি হয়।
উত্তরণের পথ: কেমন হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ নীতি?
বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে, তখন রপ্তানি বাজারে টিকে থাকা এবং অভ্যন্তরীণ জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা অর্জনে স্থানীয় সবুজ এসএমইগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা অপরিহার্য। নীতির প্রতিশ্রুতি ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যকার এই ব্যবধান দূর করতে কার্যকর ৫টি সংস্কার জরুরি:
• গ্রিন ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম ও ঝুঁকি-বণ্টন তহবিল: উদ্ভাবনী সবুজ স্টার্টআপ ও জামানতহীন এসএমইদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের (যেমন: GCF, ADB) সহায়তায় একটি বিশেষ ‘গ্রিন ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম’ চালু করতে হবে। এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি কমবে এবং তারা জামানতবিহীন প্রযুক্তি ও ধারণার বিপরীতে ঋণ দিতে উৎসাহিত হবে।
• বিকল্প অর্থায়ন ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বিকাশ: কেবল ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর না করে ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট, গ্রিন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, ক্রাউডফান্ডিং এবং ইসলামিক গ্রিন সুকুক-এর মতো বিকল্প ও ইকুইটি অর্থায়ন মডেলগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
• ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ গ্রিন উইন্ডো: সবুজ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র, নবায়ন ও ঋণ আবেদনকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সেবার আওতায় আনা প্রয়োজন। ছোট উদ্যোগের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা করে গ্রেডেড ও সহজীকৃত ছাড়পত্র পদ্ধতি চালু করতে হবে।
• সবুজ সরকারি ক্রয় নীতি (Green Public Procurement): স্থানীয় সবুজ পণ্যের প্রাথমিক বাজার নিশ্চিত করতে সরকারের বার্ষিক ক্রয়ে পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট কোটা (যেমন: ১০-১৫%) বাধ্যতামূলক করতে হবে, যা নতুন উদ্যোগগুলোর টিকে থাকার পথ সুগম করবে।
• ব্যাংকার ও উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি: ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য পরিবেশগত ঝুঁকি ও টেকনোলজি নিরীক্ষার বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং তৃণমূলের সবুজ উদ্যোক্তাদের জন্য ফিন্যান্সিয়াল ও ব্যবসায়িক লিটারেসি প্রোগ্রাম জোরদার করতে হবে।
টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তর কোনো কাগুজে নীতিমালার বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় টিকে থাকার শর্ত । আমাদের নীতি-নির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদৃশ্য নথিপত্রে যে চমৎকার অনুশাসন রয়েছে, তা যদি তৃণমূলের কারখানায়, গ্রামীণ সোলার ওয়ার্কশপে কিংবা প্লাস্টিক বিকল্প তৈরি করা তরুণ উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাবে পৌঁছাতে না পারে, তবে সবুজ অর্থনীতির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। পরিবেশগত সুশাসনকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে এবং টেকসই অর্থায়নের দুয়ার প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মুক্ত করার মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ পরিবেশ বিপর্যয় রুখে দিয়ে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, মাল্টিমিডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট - সিজিডি
