মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সারসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আগের সরকারের আমলে দুর্নীতি, অর্থ লুটপাট, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা ও দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাত। এসব সংকটের চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে।
এই পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো, দারিদ্র্য মোকাবিলা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল তিতুমীর। গতকাল শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবন চালান, তারা সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের সৃষ্টি করা কোনো সংকট নয়। একইভাবে আগের সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে যে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাট হয়েছে, তার দায়ও বর্তমান সরকারের নয়।
কিন্তু জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এসব সংকটের ক্ষতি কাটিয়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকার নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন খরচে। ফলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধির চাপ যাতে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। এ কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে যথাসম্ভব সংযত অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় যাতে আরও না বাড়ে, সেদিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে ইতিমধ্যে বহু মানুষ দারিদ্র্যের চাপে পড়েছেন। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যুক্ত হলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, নতুন করে মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া থেকে রক্ষা করা এবং আগে যারা দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন, তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অতীতের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বড় দুর্বলতা ছিল উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটি। যাদের সহায়তা পাওয়ার কথা, তাদের অনেকে তালিকার বাইরে থেকে গেছেন।
আবার প্রকৃত উপকারভোগী নন, এমন অনেকেই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। ফলে সরকারি ব্যয় সত্ত্বেও দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ যথাযথভাবে কমানো যায়নি। নতুন কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্য কমানো এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশ কমতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় সামাজিক সুরক্ষা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এসব কর্মসূচির সুফল নির্ভর করবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ব্যাংকিং খাতের সংকটকে অর্থনীতির অন্যতম বড় উত্তরাধিকারী সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন রাশেদ আল তিতুমীর। তার দাবি, আগের সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের কারণে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ও সঞ্চয় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এই ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত জনগণকে বহন করতে হতে পারে। তাই ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ বন্ধ করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, আমানতকারীরা এখন প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন এবং ব্যাংকটির প্রতি আস্থা ফেরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। অন্য যেসব ব্যাংকে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে আস্থা অর্জন করা যায় না; কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হয়। ব্যাংকিং খাতে সংস্কার এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ফলাফল দিয়েই সেই আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে সরকারের নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তাঁর মতে, অতীতে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, কর অব্যাহতি ও কর ফাঁকির কারণে রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত থেকেছে। রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, রাজস্ব বাড়াতে কর ফাঁকি ও অনিয়ম বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দিকে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।
তিনি দাবি করেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তিনি বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারলে একদিকে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপও সামাল দেওয়া সহজ হবে। আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। অতীতে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে ঘাটতি ছিল বলে তিনি দাবি করেন। বর্তমান সরকার সংস্কারের ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে চায়। তার মতে, রাজস্ব খাতের সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ অর্থনীতির প্রতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা বাড়াতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং তার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির পাশাপাশি রাজস্ব ও আর্থিক খাতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়াতে উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে উৎপাদন খাত সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন ও রফতানি বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন রাশেদ আল তিতুমীর। তিনি বলেন, সরকার বাংলাদেশকে উৎপাদনকেন্দ্র ও রফতানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলে শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য কমানো এবং আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা একটি সংকট। অন্যদিকে আগের সরকারের আমলে তৈরি হওয়া দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির বোঝাও বর্তমান সরকারকে সামলাতে হচ্ছে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নেওয়া।
বিআলো/অর্নব