রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাদক চোরাচালান ও ছিনতাই প্রতিরোধ, টিকিটের কালোবাজারি বন্ধ এবং ট্রেনে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা মোকাবিলাসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের। এছাড়া, ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের মতো বিষয়গুলোও তাদের দেখতে হয়। এতকিছুর বিপরীতে রেলওয়ে পুলিশের জনবল খুবই কম। তাহলে কীভাবে সবকিছু সমন্বয় করছে রেলওয়ে পুলিশ?
সারা দেশের বিশাল রেল নেটওয়ার্ক এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা, জনবল এবং আগামী দিনে রেলের অগ্রাধিকার নিয়ে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি (চার্জ) ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা পোস্টের নিজস্ব প্রতিবেদক মুছা মল্লিক।
ঢাকা পোস্ট : রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী বলে মনে করেন?
জিল্লুর রহমান : রেলপথের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, এখানে সক্ষমতার তুলনায় যাত্রী বেশি। বাংলাদেশ রেলওয়ে যে পরিমাণ কোচ সরবরাহ করে বা যাত্রী পরিবহন করতে পারে, তার মাধ্যমে মোট চাহিদার অর্ধেকও পূরণ করা সম্ভব হয় না। আবার যে পরিমাণ টিকিট সরবরাহ করা হয় তার তুলনায় অনেক বেশি যাত্রী ট্রেনে উঠে পড়েন। ফলে স্টেশনে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ তৈরি হয় এবং তাদের কোনোভাবেই আটকে রাখা যায় না। দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অনেক যাত্রী ট্রেনের ছাদে উঠে পড়েন। এটা সব যাত্রীর জন্যই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। পুলিশের পক্ষে এমন পরিস্থিতিতে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা পোস্ট : রেলে মাদক পরিবহন ঠেকাতে বিশেষ কোনো কৌশল আছে কি না? এটি মোকাবিলায় কীভাবে কাজ করছেন?
জিল্লুর রহমান : মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কেবল রেলওয়ে পুলিশ দেখভাল করে না। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত (বিশেষ করে কক্সবাজার সীমান্ত) দিয়ে আসা মাদক ঠেকাতে বিজিবি, এপিবিএন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং জেলা পুলিশ একসঙ্গে কাজ করে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রথম স্তরে কাজ করে। এর পরপরই দায়িত্ব পালন করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। তাদের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সরাসরি এই কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই অধিদপ্তরের নেতৃত্বে থাকেন একজন মহাপরিচালক (ডিজি) এবং পরিচালকের (অপারেশন) দায়িত্ব পালন করেন পুলিশের একজন কর্মকর্তা। তবে, সার্বিক কার্যক্রম মূলত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিজস্ব কর্মকর্তারাই পরিচালনা করে থাকেন।
আরও পড়ুন
মাদক শুধু ট্রেনে নয়, ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাসেও পরিবাহিত হয়। তবে রেলপথের বিশাল পরিধি, পুলিশ সদস্যদের স্বল্পতা এবং তল্লাশির তুলনামূলক ঘাটতির কারণে অপরাধীরা ট্রেনকে মাদক চোরাচালানের সহজ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়।
ঢাকা পোস্ট : রেলওয়ের এলাকাকে মাদক চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। মাদকের হটস্পট হিসেবে কোনো রুট কি শনাক্ত করতে পেরেছেন? এ ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে কি না?
জিল্লুর রহমান : মাদক পরিবহনের জন্য মূলত কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বেনাপোল ও দর্শনা রুট বেশি ব্যবহৃত হয়। এসব হটস্পট সম্পর্কে পুলিশ অবগত রয়েছে এবং সেখানে পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন রেখে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ মাদকসহ অপরাধীদের আটক করা হচ্ছে। তবে, সমস্যার পরিধি অনেক বড়। একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে ৫০০ থেকে ৬০০ যাত্রী থাকেন, বগি থাকে প্রায় ৩০টি। বিপরীতে পুলিশ সদস্য থাকেন মাত্র ৩-৪ জন, যাদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতেই আধা ঘণ্টা সময় লেগে যায়!

এই সমস্যা মোকাবিলায় বিমানের মতো ট্রেনেও ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ট্রেনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘টিজি পার্টি’ (ট্রেন গার্ড) মাইকে নিজের পরিচয় ও মোবাইল নম্বর যাত্রীদের জানিয়ে দেন। ফলে যাত্রীরা ছিনতাই বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হলে সরাসরি ফোনে যোগাযোগ করতে পারেন এবং পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।
ঢাকা পোস্ট : তল্লাশির সীমাবদ্ধতা ও জনবলের সংকটের কথা বললেন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের কত জনবল আছে এবং ঘাটতি কতটুকু?
জিল্লুর রহমান : রেলওয়েতে নিরাপত্তার কাজে যুক্ত রয়েছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি)। ১৮৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া জিআরপির ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের। বর্তমানে রেলওয়ে পুলিশের জনবল মাত্র ২,৪৫০ জন। পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে মালবাহী ট্রেনে এবং অর্ধেকের বেশি যাত্রীবাহী ট্রেনে পুলিশ মোতায়েন করা সম্ভব হয় না। সব ট্রেন ও মালবাহী কনটেইনারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও অন্তত ৫ হাজার জনবলের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এছাড়া, ১৯৮০ সাল থেকে চালু হওয়া আরএনবিতে ৩ হাজার অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ১ হাজার ৩০০ জন কর্মরত আছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রায় ১ হাজার ৭০০ পদ শূন্য রয়েছে।
দুই বাহিনীর দায়িত্ব ও কাজের ধরন আলাদা। রেলওয়ে পুলিশের মূল কাজ হলো ট্রেন চলাচলের শুরু থেকে গন্তব্য পর্যন্ত যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া। ২৪টি থানা ও ৩২টি ফাঁড়ির মাধ্যমে অপরাধ দমন, মামলা গ্রহণ, তদন্ত, আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আদালতে সোপর্দ করার কাজ করে রেলওয়ে পুলিশ। এছাড়া, ট্রেনে অস্ত্র ও অবৈধ মালামাল পরিবহন বন্ধ, টিকিটের কালোবাজারি রোধ এবং টিটিইদের সহায়তা করাও জিআরপির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

অন্যদিকে, আরএনবির মূল দায়িত্ব হলো প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইনসহ রেলওয়ের যাবতীয় সম্পদ ও সম্পত্তি পাহারা দেওয়া। ট্রেন ধোয়া-মোছার সময় সেখানে রাখা বগি, রাতে স্টেশনে থেমে থাকা ট্রেন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব আরএনবির।
ঢাকা পোস্ট : রেলওয়ের বিশাল এলাকা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ভেবেছেন কি না? পুরো এলাকা কীভাবে মনিটরিং করছেন?
জিল্লুর রহমান : রেলওয়ে পুলিশের নিজস্ব অর্থায়নে ইতোমধ্যে তিনটি ট্রেন এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সব জায়গায় মনিটরিং করা মূলত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বড় বড় স্টেশনগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। তবে, সব স্টেশনে এই ব্যবস্থা এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন এবং তারা এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।

ঢাকা পোস্ট : সম্প্রতি রাজশাহী ও ঢাকায় রেলে অগ্নিসংযোগসহ কিছু নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে বলে মনে করেন কি না?
জিল্লুর রহমান : ধরুন, কোনো একটি পরিবারে দ্বিতীয় স্ত্রী এলেন এবং প্রথম স্ত্রীর সন্তান রয়েছে। ওই স্ত্রীর সঙ্গে তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি বা দেবর-ভাসুরের মনোমালিন্য হলে রাগ মেটানোর জন্য তিনি গিয়ে প্রথম স্ত্রীর সন্তানকে বিনা কারণে মারধর করলেন। রেলওয়ের অবস্থাও অনেকটা এ রকম। যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় রেলওয়েকে খুব সহজ টার্গেট হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এখানে আগুন দেওয়া ও ককটেল নিক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটানো হয়।
রেলওয়ে পুলিশের মাত্র আড়াই হাজার সদস্য আর আরএনবি মিলিয়ে ৪ হাজারেরও কম জনবল দিয়ে পুরো এলাকা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিরোধী দলগুলো সহজে হামলা ও নাশকতা চালাতে পারে।
ঢাকা পোস্ট : আরএনবির কাজ রেলওয়ের সম্পত্তি রক্ষা করা। কোনো রাজনৈতিক দল ট্রেনে আগুন দিলে সেটি পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব কি আরএনবির ওপরও বর্তায়, নাকি এ দায়িত্ব শুধু রেলওয়ে পুলিশের?
জিল্লুর রহমান : ট্রেনে আগুন বা নাশকতার ঘটনা ঘটলে তা পাহারার দায়িত্ব রেলওয়ে পুলিশের পাশাপাশি অবশ্যই আরএনবির ওপরও বর্তায়। এ ধরনের ঘটনায় তদন্তের মাধ্যমে পুলিশের গাফিলতি পাওয়া গেলে যেমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, একইভাবে আরএনবির অবহেলা থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

পাশাপাশি রেললাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কি-ম্যান ও ওয়েম্যান রয়েছেন। তাদের কাজ হলো নির্দিষ্ট সময় পরপর রেললাইন পরীক্ষা করা। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় যখন রেললাইনের স্ক্রু বা ফিশপ্লেট খুলে ফেলা হয়, তখন তারা এসব বিষয় পরীক্ষা করেন। হরতাল-অবরোধের সময় ফিশপ্লেট উল্টে দেওয়া বা স্ক্রু খুলে ফেলা প্রতিরোধ ও শনাক্ত করার দায়িত্ব মূলত কি-ম্যান ও ওয়েম্যানদের। তারা কোনো অস্বাভাবিকতা বা অনিয়ম দেখলে আরএনবি বা রেলওয়ে পুলিশকে জানান। প্রয়োজনে ট্রেনের গার্ড, চালক বা স্টেশন ম্যানেজারকে বিপৎসংকেত দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে বলেন। পরে সমস্যা সমাধান করে ট্রেন চলাচল শুরু করা হয়।
ঢাকা পোস্ট : ঈদ-পূজায় ট্রেনের ভেতরে ও ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা দেখা যায়। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার কারণ কী?
জিল্লুর রহমান : আগেই বলেছি, এখানে চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চাহিদা যদি ১০০ হয়, আমরা সরবরাহ করি ৫০টি আসন। কিন্তু ১০০ জন মানুষই গন্তব্যে যেতে চান। ট্রেনের ভাড়া তুলনামূলক কম, ভ্রমণ নিরাপদ এবং নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায় বলে বাকি ৫০ জনও মনে করেন, ছাদে হলেও তারা গন্তব্যে পৌঁছাবেন।
আরও পড়ুন
ছাদে ওঠা বন্ধ করার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। কমলাপুর বা বিমানবন্দরের মতো বিশাল স্টেশনে পুলিশ থাকেন ২ থেকে ৩ জন, আরএনবির সদস্য থাকেন ২ জন। মোট পাঁচজন দিয়ে এত বড় স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পুলিশ একদিকে গেলে যাত্রীরা অন্যদিকে প্রবেশ করেন। এছাড়া, অনেক স্টেশনে ট্রেন মাত্র ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড বা এক মিনিট থামে। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অনেকে ছাদে উঠে পড়েন। আরেকটি সমস্যা হলো, স্টেশনগুলোর চারদিকে পর্যাপ্ত ঘেরাও বা নিরাপত্তা বেড়ার ব্যবস্থা নেই। স্বাভাবিক সময়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও ঈদ বা পূজার মতো উৎসবে শতভাগ বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা পোস্ট : অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরও অনেকে টিকিটের কালোবাজারির অভিযোগ করছেন এবং নানা সমস্যায় পড়ছেন। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
জিল্লুর রহমান : এখন আর আগের মতো ব্যাপকভাবে কালোবাজারি হয় না। তবে সমস্যা হলো, একটি আইডি দিয়ে চারটির বেশি টিকিট কাটা যায় না। কিন্তু অসাধু চক্র ১০ থেকে ১৫টি আইডি ব্যবহার করে ৬০টি টিকিট কেটে ফেলে। পরে সেগুলো নিজেদের কাছে রেখে বেশি দামে বিক্রি করে। আলাদা আলাদা আইডি ব্যবহার করায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষে এসব শনাক্ত করা কঠিন হয়। তবে আমরা তাদের ধরছি, গ্রেপ্তার করছি এবং ঘটনাস্থলেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হচ্ছে। অনলাইন টিকেটিং চালু হওয়ার পর কালোবাজারি অনেকাংশে কমেছে। কীভাবে ব্যবস্থাটিকে আরও উন্নত করে কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ করা যায়, সে বিষয়ে আমরা রেলওয়েকে জানিয়েছি। শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব না হলেও এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।
ঢাকা পোস্ট : নারী যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন?নারীযাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন?
জিল্লুর রহমান : যেসব স্টেশনে রেলওয়ে থানা রয়েছে, সেখানে নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা হেল্প ডেস্ক আছে। আর যেখানে থানা নেই বা বড় বড় স্টেশন রয়েছে, যেমন কমলাপুর, বিমানবন্দর ও টঙ্গী, সেখানে পুলিশ হেল্প ডেস্ক রয়েছে। সেখানে আমাদের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন। নারী, শিশু কিংবা সাধারণ যাত্রীরা জিডি, মামলা, ছিনতাই-সংক্রান্ত অভিযোগ বা যেকোনো তথ্যের জন্য পুলিশের আইনি সহায়তা নিতে পারেন।
ঢাকা পোস্ট : সিসিটিভির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কমলাপুরে ওয়াশফিটের ট্রেনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করা গেছে?
জিল্লুর রহমান : সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হয় বলেই কমলাপুরে ওয়াশফিটের ট্রেনে আগুন দেওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে পেরেছি। তারা দুজনই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। একজন রেলওয়ের নিম্নপর্যায়ের কর্মচারী, যিনি তার জীবনের শুরুর দিকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলমান। আশা করছি, দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

ঢাকা পোস্ট : ৫ আগস্টের আগে ও পরের পুলিশিং কীভাবে দেখছেন? একজন ব্যারিস্টার ও অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা থেকে বলুন।
জিল্লুর রহমান : ৫ আগস্টের আগে শেখ হাসিনা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে খুশি করতে পুলিশ খুব মরিয়া ছিল। তখন তারা নিয়মকানুন মানত না, যাকে-তাকে আটক, গুম বা গ্রেপ্তার করত। ৫ আগস্টের পর, বিশেষ করে ড. ইউনূসের দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ ধরনের ঘটনা ছিল না। তবে, তখন সংঘবদ্ধভাবে মব তৈরি করা বা মব কালচারের অনেক ঘটনা ঘটেছে।
আরও পড়ুন
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত সাত মাসে আওয়ামী লীগ আমলের মতো গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের ঘটনা নেই। আবার ড. ইউনূসের আমলের মব কালচারও গত কয়েক মাসে নেই। তবে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হতে হতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন বর্তমান আইজিপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র সচিবের দিকনির্দেশনায় আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। পুলিশের সদস্যরাও আইনের মধ্যে থেকে কাজ করার চেষ্টা করছেন।
৫ আগস্টের পর পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এসব বিচার প্রক্রিয়ার কারণে অনেক পুলিশ সদস্যের মনে একধরনের অজানা ভয় বা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে তারাও এমন বিপদে পড়তে পারেন। এই ভয় কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগছে। আশা করছি, আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে পুলিশ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
ঢাকা পোস্ট : আগামী তিন বছরে রেলওয়ে পুলিশে তিন বা চারটি বড় পরিবর্তনের কথা বললে কোনগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন?
জিল্লুর রহমান : আমি চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেব—
১. ট্রেনের ছাদে যাত্রা বন্ধ করা।
২. পুলিশি নজরদারি ও সচেতনতা বাড়িয়ে রেলে অপমৃত্যু প্রতিরোধ করা।
৩. ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করা। এসব ঘটনায় মামলা করা এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা।
৪. রেলওয়ে পুলিশ ও আরএনবির জনবল দ্বিগুণ করে মাদকের ভয়াবহতা ও মাদক পরিবহনের রুট বন্ধের চেষ্টা করা।
ঢাকা পোস্ট : রেলওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে সাধারণ মানুষের প্রতি আপনার বার্তা কী?
জিল্লুর রহমান : রেলওয়ে সরকারি সম্পদ। এটিকে নিজের সম্পদ মনে করুন। কোনোভাবেই এর ক্ষতি করবেন না। সরকার রেলওয়েতে বিশাল ভর্তুকি দেয়। গড়ে দুই টাকা খরচ করলে এক টাকা আয় হয়, অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হয়। আপনারা ট্রেনে আগুন দেবেন না, ককটেল নিক্ষেপ করবেন না। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোর দাবি আদায়ের অনেক পথ রয়েছে। অনুগ্রহ করে রেলওয়ের সম্পদে আগুন দেবেন না, ক্ষতি করবেন না। সাধারণ যাত্রীরাও টিকিটের কালোবাজারি থেকে টিকিট কেনা কিংবা বিনা টিকিটে ভ্রমণ করা বন্ধ করুন। রেলওয়ে আপনাদের সম্পদ। তাই এই সম্পদ রক্ষায় আপনারাও এগিয়ে আসুন।
ঢাকা পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
জিল্লুর রহমান : আপনাকেও ধন্যবাদ। ঢাকা পোস্টের জন্য শুভকামনা।
এমএম/এমএসএ
