কুমিল্লায় বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়া স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বাসা থেকে মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার নিয়ে নিখোঁজ হওয়া চার ক্ষুদে স্কুলছাত্রীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকা থেকে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কোতোয়ালি থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে।
পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্যমতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টিকটকের ফ্যান্টাসিতে বিভ্রান্ত হয়ে তারা স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছিল।
বুধবার দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
পুলিশ সুপার জানান, গত ১২ অক্টোবর সকালে কুমিল্লা নগরীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী এবং তাদেরই এক শিক্ষার্থীর তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোন বিদ্যালয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। তারা ক্লাসে উপস্থিত না হওয়ায় বিষয়টি জানাজানি হলে অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে অবহিত করে। থানায় পৃথক চারটি নিখোঁজ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হওয়ার পরপরই পুলিশ উদ্ধার অভিযান শুরু করে এবং দেশজুড়ে বেতার বার্তা পাঠানো হয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার স্কুলছাত্রী তাজমিনের ঘটনাটি মাথায় রেখে পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ শুরু করে। জেলা ডিবি ও থানা পুলিশ যৌথভাবে সম্ভাব্য স্থানগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সোমবার গভীর রাতে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট থানা পুলিশের সহায়তায় ওই চার শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করে।
উদ্ধারের পর মঙ্গলবার তাদের কুমিল্লায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। শিক্ষার্থীরা পুলিশকে জানায়, তারা পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল না এবং নিয়মিত মোবাইল ব্যবহার করে টিকটকে ভিডিও আপলোড করত। টিকটক ও সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদে পঞ্চম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আবু হুজাইফা, মারজান, হৃদয়, জিসান, সুজন, মিনহাজ, মোফাজ্জল ও শোয়েব নামের কয়েক যুবকের পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে, যদিও তারা ওই যুবকদের প্রকৃত ঠিকানা জানত না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাল্পনিক জীবনের প্রভাবে বিভ্রান্ত হয়ে স্বাধীন জীবনযাপন ও পরিচিত যুবকদের সঙ্গে নতুন করে পথ চলার উদ্দেশ্যে তারা বাসা থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পালায়। ঘর ছাড়ার দিন সকালে কুমিল্লার বাহার মোবাইল মার্কেটে এক ছাত্রী তার পরিবারের একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন চার হাজার টাকায় বিক্রি করে। সেই টাকা ও সঙ্গে আনা স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা প্রথমে ঢাকায় যায়।
ঢাকায় গিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী সুবিধা করতে না পেরে তারা হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে এক শিক্ষার্থীর দাদার বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সুনির্দিষ্ট ঠিকানা না জানায় অটোরিকশায় ঘোরাঘুরির সময় পুলিশ তাদের সন্ধান পায়। পরে পুলিশ উদ্ধারকৃতদের তথ্যমতে কুমিল্লা নগরীর টাউন হল সুপার মার্কেটের একটি দোকান থেকে বিক্রি করা মোবাইল ফোনটি এবং তাদের সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার জব্দ করে।
অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া তাদের বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সঠিক সময়ে তথ্য পাওয়ায় চার শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে ওই চার ছাত্রীকে ঘর ছাড়তে কোনো চক্র বা যুবকেরা প্ররোচিত করেছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পংকজ বড়ুয়া, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান এবং ডিবির ওসি মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহসহ পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর হোসেন জানান, উদ্ধার হওয়া চার শিশুকে আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে অভিভাবকদের জিম্মায় হস্তান্তরের কাজ চলছে।
জেএইচআর
