দেশে আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও নিষ্পত্তিতে গতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এলসি খোলা প্রায় ১৯ শতাংশ এবং এলসি নিষ্পত্তি প্রায় ১১ শতাংশের মতো বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির চিত্র সব পণ্যে এক নয়। জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের মধ্যবর্তী উপকরণ আমদানিতে এলসি খোলা বাড়লেও মূলধনী যন্ত্রপাতিতে কমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানির এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও তা অর্থনীতিতে গতি ফেরার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে না। কারণ, এলসি খোলার আর্থিক মূল্য বৃদ্ধি মানে আমদানির প্রকৃত পরিমাণ বৃদ্ধি নয়; আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। আবার সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের মতো খাতে হলেও মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্প কাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তি কমেছে। ফলে এই পরিসংখ্যান থেকে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বা সামনে গতিশীল হবে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, এলসি খোলায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও এটিকে অর্থনীতিতে গতিশীলতা ফেরার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, সার্বিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কোন ধরনের পণ্যের আমদানি বাড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি গতিশীল হলে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামালের আমদানি বাড়ার কথা। কিন্তু বর্তমান চিত্রে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি দুই-ই কমেছে। শিল্প কাঁচামালের এলসি খোলায় সামান্য প্রবৃদ্ধি থাকলেও নিষ্পত্তি এখনও নেতিবাচক। আবার এলসি খোলার আর্থিক মূল্য দিয়ে আমদানির প্রকৃত পরিমাণ কতটা বেড়েছে, তাও নিশ্চিত হওয়া যায় না, বরং মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা কমে যাওয়া এবং শিল্প কাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তি হ্রাস পাওয়ার মতো প্রবণতা অর্থনীতির স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, দেশের রপ্তানি বাড়াতে হলে আমদানির প্রবাহও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং শিল্পের পশ্চাৎ-সংযোগের (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) সঙ্গে সম্পর্কিত উপকরণের আমদানি বাড়াতে হবে। কারণ, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি না বাড়লে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আর রপ্তানি বাড়তে না পারলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য ২ হাজার ১৯৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৪৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এলসি খোলা বেড়েছে ১৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। একই সময়ে আমদানির বিপরীতে এলসি নিষ্পত্তিও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১ হাজার ৮৭৯ কোটি ২০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৯৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। সে হিসাবে নিষ্পত্তি বেড়েছে ১০ দশমিক ৮০ শতাংশ।
জ্বালানির এলসিতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি : আমদানির এলসি খোলায় সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোপণ্যে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এ
খাতে ৩৭৭ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২২৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি পণ্যে এলসি খোলা বেড়েছে ৬৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। শুধু এলসি খোলার অঙ্কেই নয়, মোট আমদানি এলসিতে জ্বালানি পণ্যের অংশও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মোট এলসি খোলায় পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোপণ্যের অংশ ছিল ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ১৭ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরে মোট এলসিতে জ্বালানি পণ্যের অংশ বেড়েছে ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ পয়েন্ট। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই পণ্যটির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও সুয়েজ খালকেন্দ্রিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব থাকতে পারে।
ভোগ্যপণ্যের এলসিও ঊর্ধ্বমুখী : ভোগ্যপণ্য আমদানিতেও এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে খাদ্যপণ্যের ১৯৩ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৬০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ফলে এ খাতে এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে এ সময়ে ভোগ্যপণ্যের এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ খাতে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১৬০ কোটি ২০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৩৪ কোটি ২০ লাখ ডলার।
শিল্পের কাঁচামালের চেয়ে মধ্যবর্তী পণ্যে এলসির গতি বেশি : চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মধ্যবর্তী পণ্য খাতে ১৩৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১০৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারের তুলনায় ২৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি ৩৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ বেড়ে ১২৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৯৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে শিল্প কাঁচামাল আমদানির জন্য ৬৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৬৫৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। একই সময়ে পণ্যটির এলসি নিম্পত্তি কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। শুধু তাই নয়, মোট আমদানি এলসিতে এই পণ্যের অংশও কমেছে। আগের অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মোট এলসি খোলায় শিল্প কাঁচামালের অংশ ছিল ৩৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে ৩০ দশমিক ৮৬ শতাংশ হয়েছে। এদিকে, রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যবহৃত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির ক্ষেত্রে নতুন এলসি খোলা বাড়লেও নিষ্পত্তি কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এ ধরনের এলসি খোলা হয়েছে ২৯১ কোটি ১০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ২৮২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের তুলনায় ৩ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি। তবে এসব এলসির বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ কম।
মূলধনী যন্ত্রপাতিতে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি দুই-ই কমেছে : সামগ্রিক আমদানি এলসি খোলার প্রবৃদ্ধির বিপরীতে মূলধনী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এ খাতে ৫১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতিতে এলসি খোলা কমেছে ৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। একই সময়ে পণ্যটির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মোট আমদানি এলসিতেও এই পণ্যটির অংশ কমেছে। আগের অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এ অংশ ছিল ২ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমে ২ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বেসরকারি ঋণেও ধীরগতি : আমদানির পরিমাণ বাড়লে (এলসি নিষ্পত্তি) বেসরকারি খাতের ঋণেও তার প্রভাব দেখা যায়। গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ছিল ইতিহাসে সর্বনিম্ন। তবে আমদানিতে কিছুটা গতি আসায় সেপ্টেম্বরে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে দীর্ঘসময় ধরে ৫ শতাংশের নিচে থাকা বেসরকারি ঋণের এই প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাণিজ্যের ধীরগতিকেই তুলে ধরে। এ বিষয়ে অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক বলেন, আমদানির সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে। আমদানি অর্থায়নের জন্য ব্যবসায়ীদের ব্যাংকঋণের প্রয়োজন হয়। ফলে আমদানির এলসি খোলার প্রবণতা বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ারও সুযোগ থাকে।
