এক মাসের ছুটি কাটাতে পরিবারের কাছে এসেছিলেন সৌদি আরবপ্রবাসী শাহেদ আহমেদ আশিক (৩৫)। স্ত্রী, দুই সন্তান ও স্বজনদের ছেড়ে জীবিকার তাগিদে আবারও সৌদি আরবে ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পর স্ত্রী কাকলী বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার কিছুক্ষণ পরই হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারান শাহেদ। স্বামী-স্ত্রীর সেই ফোনালাপই হয়ে রইল শেষ কথা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুরে কফিনবন্দী শাহেদের মরদেহ পৌঁছায় বগুড়া সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের মাদলা গ্রামের বাড়িতে। মরদেহবাহী গাড়ি গ্রামে প্রবেশ করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে ছুটে আসেন প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা। স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী কাকলী বেগমের আহাজারি আর দুই সন্তানের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকার পরিবেশ।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, এক মাসের ছুটি শেষে গত ৯ অক্টোবর রাতে সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হন শাহেদ। পরদিন ১০ অক্টোবর স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটার দিকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ এলাকা থেকে স্ত্রী কাকলী বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন। কথোপকথন শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ওই টার্মিনালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এতে শাহেদসহ ১৩ জন নিহত হন। আহত হন আরও ২৭ জন প্রবাসী বাংলাদেশি।
যে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন কাকলী, শেষ পর্যন্ত সেই স্বামীকে গ্রহণ করতে হলো কফিনবন্দী অবস্থায়। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে হাজার মাইল দূরে পাড়ি জমানো মানুষটির এমন মৃত্যু স্বজনদের কাছে যেন অবিশ্বাস্য বাস্তবতা।
শাহেদের বাবা রফিকুল ইসলাম ২০ বছরের বেশি সময় ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। তাঁর মা শাহেরা বেগমও পবিত্র ওমরাহ পালনের জন্য সেখানে ছিলেন। ছেলের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে চার দিন আগে দেশে ফেরেন তিনি। পরিবারের এই শোকাবহ ঘটনায় স্বজনদের জীবনে নেমে এসেছে গভীর শোক।
শুক্রবার সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে শাহেদের মরদেহবাহী বিমান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের উপস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক দাফন ও যাতায়াত খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং বিশেষ অনুদান হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে পরিবারকে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শাহেদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সা’দ আল ঈসা কন্ট্রাক্টিং কোম্পানি তাঁর বকেয়া বেতন-ভাতা ও সার্ভিস বেনিফিট বাবদ প্রায় ৯ লাখ টাকা রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে জমা দিয়েছে। বৈধ বিএমইটি কার্ড ও বিমা সুবিধার আওতায় তাঁর পরিবার আরও আর্থিক সহায়তা পেতে পারে।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে যান বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু।
সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা বলেন, শাহেদের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরপরই প্রবাসীদের কল্যাণে নিয়োজিত দপ্তর ও রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শোকাহত পরিবারটির পাশে সরকার সব সময় থাকবে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, মরদেহ দেশে আনা, প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করা এবং ঢাকা থেকে বগুড়ায় পরিবহনের ব্যবস্থা সহজ করতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও নিহত প্রবাসীর পরিবারের প্রয়োজনে পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
শুক্রবার আসরের নামাজের পর বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার সরকারি চাঁচাইতারা মাদলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শাহেদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
