অভ্যন্তরীণ বাজারে উদ্বৃত্ত উৎপাদন এবং খাদ্যভ্যাসে বড় পরিবর্তনের জেরে বিশ্ববাজারে সস্তা মুরগির মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের ব্যাপক রফতানি শুরু করেছে চীন। ইস্পাত, সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক গাড়ির পর এবার বৈশ্বিক আমিষের বাজারেও বেইজিংয়ের এই আগ্রাসী উপস্থিতি থাইল্যান্ড, ব্রাজিল ও ইউরোপের মতো প্রতিষ্ঠিত উৎপাদকদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বাণিজ্য সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে ঐতিহ্যবাহী চর্বিযুক্ত শূকরের মাংসের চাহিদা দ্রুত কমছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে দেশটিতে মাথাপিছু শূকরের মাংস খাওয়া ১৩ শতাংশ কমেছে, অন্যদিকে গত এক দশকে মুরগির মাংসের ব্যবহার বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। সংকটে পড়া হেব্বেই প্রদেশের শূকর খামারি হুয়াং উইয়িং পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, "আমি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শূকর পালন করছি, কিন্তু গত দুই বছরের মতো কঠিন সময় কখনো আসেনি। শূকরের দাম এতটাই কমে গেছে। শহরের মানুষ শূকরের মাংস খাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে।"
চাহিদা কমলেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেইজিংয়ের বিপুল আর্থিক ভর্তুকির কারণে দেশটিতে আমিষের উৎপাদন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা খামারিদের মোট আয়ের প্রায় ১৩ শতাংশই এসেছে সরকারি ভর্তুকি থেকে। অতিরিক্ত এই উৎপাদনের চাপ সামাল দিতে চীনা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিশ্ববাজারের দিকে ঝুঁকছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চীনের উইনটপ ফুডের মহাব্যবস্থাপক ড্যাং ইয়াংইয়াং বলেন, "আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগে মান নিয়ে অবিশ্বাস পোষণ করতেন। কিন্তু যখন ব্রাজিল ও থাইল্যান্ডের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে প্রতি টনে মাংসের দাম এক হাজার ডলার কমে পাওয়া যায়, তখন তাদের চীন থেকে কেনা ছাড়া উপায় থাকে না অথবা লোকসানের মুখে পড়তে হয়।" বর্তমানে ঘানা, ইরাক, জর্ডান, রাশিয়াসহ বিশটিরও বেশি দেশে মুরগির মাংস রফতানি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
একইভাবে বহির্বিশ্বে নিজেদের অবস্থান বাড়াতে শুরু করেছে চীনের দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও। দেশটির শীর্ষস্থানীয় দুগ্ধ কোম্পানি ইলির শিশুখাদ্য বিপণন বিভাগের প্রধান ঝাং ইউয়ান মন্তব্য করেন, "চীনের প্রতিটি পশুপালন সংস্থা বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। আপনি যদি বড় হতে চান, তবে আপনাকে অবশ্যই বিদেশে যেতে হবে।"
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর চীন মুরগির মাংসের নিট রফতানিকারকে পরিণত হয়েছে এবং প্রায় ২৬০ কোটি ডলারের মুরগির মাংসের পণ্য বিদেশে পাঠিয়েছে, যা চার বছর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রক্রিয়াজাত পোল্ট্রির বাজারে চীনের হিস্যা বেড়ে দ্বিগুণ এবং যুক্তরাজ্যে তিনগুণ হয়ে যথাক্রমে ১০ ও ১৪ শতাংশে ঠেকেছে।
চীনের এই আগ্রাসী দরপতন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। থাই ব্রয়লার প্রসেসিং এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপক কুকরিত আরেপাগর্ন সতর্ক করে বলেন, "এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ক্রেতারা এখন দরকষাকষির ভিত্তি হিসেবে চীনের সস্তা মুরগির দামকে ব্যবহার করছেন।"
ইউরোপীয় কমিশন ইতিমধ্যে চীনের হাঁসের মাংসের আমদানির ওপর ডাম্পিংবিরোধী তদন্ত শুরু করেছে এবং কৃত্রিম আমিষের ওপর ৪১ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। যদিও মুরগির মাংসের ক্ষেত্রে এখনো সরাসরি শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তবে সামগ্রিক বাজার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে অতীতে চীনের সুনাম ক্ষুণ্ণ হলেও ক্রেতাদের কাছে কম মূল্যের সুবিধাই প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা তুলে ধরে ড্যাং ইয়াংইয়াং স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "আমরা যেসব দেশে সম্ভব রফতানি করছি। দামের দিক দিয়ে যদি আপনার বড় ধরনের সুবিধা থাকে, তবে অনেক ক্রেতা নিজেই আপনার সন্ধান করে নেবে।"
