বঙ্গোপসাগরের বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ জোরদার করছে সরকার। এ লক্ষ্যে সামুদ্রিক জলজ চাষ, কাঁকড়া উৎপাদন ও রপ্তানি, গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ এবং সামুদ্রিক গবেষণায় নতুন নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রণয়নের পাশাপাশি সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও সামুদ্রিক সম্পদের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে মাছ ধরা এবং সমুদ্রের তলদেশে জ্বালানি অনুসন্ধানে বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামুদ্রিক সম্পদকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় সম্প্রসারণ এবং সমুদ্রভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধারের উদ্যোগ
সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নতুন কাঠামো নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ডের আওতায় অগভীর ও গভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে অগভীর সমুদ্রের ১১টি এবং গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লক রয়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, উল্লেখযোগ্যভাবে শিথিল শর্তে সমুদ্রের ২৬টি ব্লকেই অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, উপকূলীয় ভোলা ও ফেনী অঞ্চলে গ্যাসের মজুত পাওয়া যাওয়ায় সমুদ্রেও গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার বিষয়ে সরকার আশাবাদী।
নতুন উৎপাদন-অংশীদারত্ব চুক্তির কাঠামোয় গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইন নির্মাণে সহায়তা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় শর্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে অনুসন্ধানে আগ্রহী করে তোলা এবং দেশের সম্ভাব্য সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি সম্পদ আবিষ্কারের পথ সুগম করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা গেলে তা দেশের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হবে।
তবে সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ, উন্নত জরিপ প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য খাতে টেকসই উৎপাদনের পরিকল্পনা
সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে সামুদ্রিক জলজ চাষ বা মেরিকালচার নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে সরকার। এতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সামুদ্রিক জলজ চাষকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ লাখ ৫৫ হাজার টনে। এই উৎপাদন দেশের বার্ষিক প্রায় ৫০ লাখ টন মাছের চাহিদার চেয়ে বেশি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত নীতিমালায় সামুদ্রিক জলজ চাষ সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে প্রচলিত উপকূলীয় মৎস্য আহরণের বাইরে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, সামুদ্রিক জলজ প্রাণী উৎপাদন এবং সমুদ্রভিত্তিক অন্যান্য শিল্প বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কাঁকড়া উৎপাদন ও রপ্তানিতে নজর
কাঁকড়ার উৎপাদন, আহরণ, ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি আরও সুশৃঙ্খল করতে ‘টেকসই কাঁকড়া উৎপাদন, আহরণ, ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি নির্দেশিকা-২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে সরকার।
প্রস্তাবিত নির্দেশিকায় কাঁকড়ার জীববৈচিত্র্য রক্ষা, উৎপাদনপদ্ধতির উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আহরণ-পরবর্তী ক্ষতি কমানো, হিমাগার ও শীতল সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের প্রস্তাব রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উন্নত চাষ ও আহরণপদ্ধতি অনুসরণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা গেলে কাঁকড়ার গুণগত মান বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণে নতুন নির্দেশিকা
বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) বাইরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় দেশের পতাকাবাহী মাছ ধরার জাহাজ পরিচালনা নিয়ন্ত্রণে ‘গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ নির্দেশিকা-২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে মৎস্য অধিদপ্তর।
এতে জাহাজের লাইসেন্স, মাছ ধরার কার্যক্রম, আহরণ করা মাছের হিসাব সংরক্ষণ, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে মাছ স্থানান্তর, মাছের উৎস শনাক্তকরণ, নজরদারি, নাবিকদের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাশাপাশি অবৈধ, অনিবন্ধিত ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ বন্ধ এবং দেশীয় আইন ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মৎস্য আহরণ সম্প্রসারণের জন্য শুধু নির্দেশিকা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। মাছের মজুত সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, আধুনিক জাহাজ, উন্নত মাছ ধরার প্রযুক্তি, জাহাজ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাছের প্রজাতি ও মজুতের স্থায়িত্ব বিবেচনায় নিয়ে আহরণ সক্ষমতা নির্ধারণ জরুরি।
সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বাড়ছে
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মাছের মজুতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে কুয়াকাটা ও সালিমপুরে দুটি নতুন সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার। এর ফলে দেশে ঘোষিত সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ও সামুদ্রিক রিজার্ভের সংখ্যা বেড়ে সাতটিতে দাঁড়িয়েছে।
এসব এলাকা সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষা এবং মাছের মজুত পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, কার্যকর নজরদারি, টেকসই অর্থায়ন এবং উপকূলীয় জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৫ কোটি ডলার।
লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্যের মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাতকরণ, শীতল সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নীল অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে নীল অর্থনীতি গবেষণার জন্য পৃথক তহবিলে রাখা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা।
বন্দর ও সমুদ্রভিত্তিক শিল্পেও সম্ভাবনা
মৎস্য ও জ্বালানি খাতের বাইরে জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক পরিবহন, পণ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং সমুদ্রভিত্তিক সেবাশিল্পেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং পায়রা বন্দরের কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ সমুদ্রকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও শিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তবে সমুদ্রভিত্তিক শিল্পের বিকাশে বন্দর ও উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশাল সামুদ্রিক সম্পদকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
সামুদ্রিক সম্পদের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
মেরিকালচার, কাঁকড়া উৎপাদন ও গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ নিয়ে নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রণয়ন, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ এবং গবেষণায় অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে নীল অর্থনীতি বিকাশের একটি নীতিগত ভিত্তি তৈরি করছে সরকার।
এখন এসব উদ্যোগকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়াই প্রধান চ্যালেঞ্জ। কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ দেশের রপ্তানি আয়, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।
The post নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ‘বড় উদ্যোগ’ appeared first on ভোরের চেতনা.
