দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র নেতানেত্রীরা। প্রধান বিচারপতির হাতে স্মারকলিপি তুলে দেওয়ার কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু বিরোধী নেতানেত্রীদের সঙ্গে দেখা করার সময় দেননি প্রধান বিচারপতি কান্ত। রবিবার বিরোধীদের আবেদন খারিজ করে দেন তিনি। কেন দেখা করবেন না, তার চার যুক্তিও বিরোধীদের দেওয়া চিঠির উত্তরে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তবে তার পরেও সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে মিছিল করেন রাহুল গাঁধী, প্রিয়ঙ্কা বাড্রা গাঁধী, নেহা বোরা, অখিলেশ যাদবেরা। যদিও সেই মিছিল বা দিল্লিতে চলমান বিক্ষোভ, পুলিশি ধরপাকড় নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি প্রধান বিচারপতি। এক মামলার শুনানিতে এজলাসে বসে তাঁর পরামর্শ, রাজনীতিতে সুপ্রিম কোর্টকে জড়ানো উচিত নয়।
জ্ঞানেশ-বিরোধী বিক্ষোভে গত কয়েক দিন ধরেই উত্তাল দিল্লি। শুধু রাজধানী নয়, দেশের নানা প্রান্তেও প্রভাব পড়েছে এই বিরোধী আন্দোলনের। তবে দিল্লি যেন এখন এই গোটা আন্দোলনের ‘নেতৃত্বে’। বিরোধী শিবির তো বটেই, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-ও জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে পথে নেমেছে। শনিবার তাদের ‘যন্তর মন্তর ২.০’ অভিযান ছিল। যদিও তাদের কোনও মিছিলই শেষ পর্যন্ত যন্তর মন্তর পৌঁছোতে পারেনি। তার আগের দিন এই একই অভিযোগ তুলে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে ‘ইন্ডিয়া’র ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে রাহুল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরা জানান, সোমবার সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে তাঁর হাতে স্মারকলিপি দেবেন। সেই মতো প্রধান বিচারপতিকে চিঠিও লেখেন রাহুলেরা। তবে রবিবার প্রধান বিচারপতি জানিয়ে দেন, তিনি বিরোধী নেতানেত্রীদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না।
কেন ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের সাক্ষাৎ-প্রার্থনায় সায় দিলেন না প্রধান বিচারপতি কান্ত? চারটি কারণ দেখিয়ে বিরোধীদের আবেদন খারিজ করেন তিনি। প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, বিরোধীদের তোলা অভিযোগ সংক্রান্ত একগুচ্ছ মামলা ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। সেই কারণে আদালতের বাইরে (অর্থাৎ শুনানি ছাড়া) এই সব বিষয় নিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, এই ধরনের অভিযোগ বিবেচনা করা বা তার ভিত্তিতে কোনও পদক্ষেপ করা আদালতের প্রশাসনিক এক্তিয়ারের আওতায় নেই। তৃতীয়ত, প্রধান বিচারপতির মতে, দেশের সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং অন্যান্য ধারার অধীনে আদালতের বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা রয়েছে। তাই সোমবার যদি এই অভিযোগগুলি নিয়ে কোনও আবেদন বা মামলা করা হয়, তবে পরের দিন, অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের তালিকাভুক্ত মামলাগুলির পরবর্তী শুনানির দিন তা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়াও, দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্ট যে দায়বদ্ধ, তা বিরোধীদের চিঠিতে উল্লেখ করেছেন প্রধান বিচারপতি কান্ত। এ-ও জানিয়েছেন, নাগরিকদের জন্য আদালতের দরজা সবসময় খোলা আছে।
‘আমার বিষয় নয়’
প্রধান বিচারপতি সময় না দিলেও ‘সুপ্রিম কোর্ট চলো’ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ‘ইন্ডিয়া’র নেতানেত্রীরা। শুধু বিরোধীদের মিছিল নয়, প্রায় প্রতি দিন দিল্লি জুড়ে যে বিক্ষোভ, পুলিশের বিধিনিষেধ, ধরপাকড় ইত্যাদি প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘‘এটা আমার বিষয় নয়। আইনশৃঙ্খলার ব্যাপার।’’ বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করার প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করতে চাননি প্রধান বিচারপতি কান্ত। এর পরেই প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘সাধারণ মানুষ হোক বা নির্বাচিত প্রতিনিধি— যে কেউ চাইলেই আমাদের কাছে আসতে পারেন। সেই অধিকার রয়েছে সকলের। আমরা আইন অনুযায়ী বিষয়গুলি শুনব।’’
‘সুপ্রিম কোর্টকে রাজনীতির মধ্যে টেনে আনবেন না’
রাজনীতির মধ্যে সুপ্রিম কোর্টকে না-টানার পরামর্শ দেন প্রধান বিচারপতি। সোমবার সকালে আইনজীবীদের দায়ের করা এক মামলায় তাঁর মন্তব্য, ‘‘এই সমস্ত গণতান্ত্রিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া উচিত। তবে সুপ্রিম কোর্টের কাজকর্মের ক্ষেত্রে... আমি আন্দোলনকারীদের কাছেও অনুরোধ করেছি, সুপ্রিম কোর্টকে কোনও ধরনের রাজনীতির মধ্যে টেনে আনা উচিত নয়।’’ তবে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি। আইনজীবীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতির বার্তা, ‘‘শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন করুন। কিন্তু আইনজীবী, আদালতের কর্মী, মামলা-মোকদ্দমার সঙ্গে যুক্ত যাঁরা, তাঁদের কার্যক্রমে যেন কোনও ভাবেই বাধা না আসে।’’
