নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এবার সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন ভারতের বিরোধী দলগুলোর নেতারা। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া স্থগিত করা থেকে শুরু করে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া পর্যন্ত ১০টি দাবি জানিয়ে আদালতে আবেদন করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।
আবেদনে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কারণ প্রকাশ, স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং নাম বাদ দেওয়ার আগে ভোটারদের নোটিশ দেওয়া ও শুনানির সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (১২ অক্টোবর) দিল্লিতে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লকের বিক্ষোভ মিছিল শেষে সুপ্রিম কোর্টে যান রাহুল গান্ধীসহ বিভিন্ন দলের নেতারা। তাদের সঙ্গে কয়েক শ সমর্থকও ছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) স্থগিতসহ বিভিন্ন দাবি জানান তারা।
বিজ্ঞাপন
তবে, বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে রাহুল গান্ধী আদালতে পৌঁছাতে পারেননি। তাই তার পক্ষে আইনজীবী এস প্রসন্ন আবেদনটি জমা দেন। এতে এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের নেওয়া অন্যান্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ১০টি দাবি তুলে ধরা হয়।
বিক্ষোভ মিছিলে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদবসহ বিভিন্ন দলের নেতারা।
এর আগের দিন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে রাজি হননি। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় তিনি সাক্ষাৎ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছিলেন। এরপর বিরোধী নেতারা যৌথভাবে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে আবেদনটি ‘রাহুল গান্ধী বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন’ নামে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও জানানো হয়েছে।
আবেদনে রাহুল গান্ধীর ১০ দাবি
১. এসআইআর-সংক্রান্ত সব নথি জমা দিতে হবে
বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শুরুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত সব নথি, বৈঠকের কার্যবিবরণী, চুক্তি ও আপত্তির তথ্য আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, ২০২৫ সালের ২৪ জুন এসআইআর শুরুর সিদ্ধান্তের নথি এবং ইসিনেট ও ইরোনেট ব্যবস্থায় প্রবেশ ও ব্যবহারের তথ্যও জমা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
২. এসআইআরের সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা যাচাই
এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং ২০২৩ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও মেয়াদ) আইনের ১৮ নম্বর ধারা মেনে নেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া, আইনগত ক্ষমতা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে তা বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে।
৩. দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধনের ক্ষেত্রে সংবিধান বা আইন লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩২ নম্বর ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
৪. আবেদনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে
এসআইআর-সংক্রান্ত আবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের লিখিত রেকর্ড রাখা এবং ২০২৩ সালের আইনের ১৮ নম্বর ধারা অনুসরণ নিশ্চিত করার আবেদন করা হয়েছে।
৫. অনলাইন ফর্ম-৬ নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী করতে হবে
ভোটার তালিকায় নাম তোলার অনলাইন ফর্ম-৬ যেন ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালায় নির্ধারিত ফর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেই নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, যথাযথ নিয়মে বিধিমালা সংশোধন না করা পর্যন্ত নির্ধারিত ফর্মে কোনো পরিবর্তন না আনার দাবি জানানো হয়েছে।
৬. স্বাধীন তদন্ত ও নিরীক্ষা কমিটি গঠন
সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন তদন্ত ও নিরীক্ষা কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। কমিটিতে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ কমিটি এসআইআরের সময় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও সংশোধনের ঘটনা তদন্ত করবে।
পাশাপাশি, ভোটার তথ্যভাণ্ডারে কারা প্রবেশ করতে পেরেছেন এবং কী কী পরিবর্তন করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখবে। ইসিনেট ও ইরোনেট ব্যবস্থাও এর আওতায় থাকবে। এ ছাড়া, ইভিএমের প্রযুক্তিগত কাঠামো, নকশা, নীতিমালা ও ব্যবহার পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভালো চর্চাগুলোও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৭. বাদ পড়া ভোটারদের নাম ও কারণ প্রকাশ
এসআইআরের সময় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া সবার নাম বুথভিত্তিক প্রকাশের নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, প্রত্যেক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং তাঁদের বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্য প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। যারা ভোটার তালিকায় থাকার যোগ্য, তাদের নাম ফের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থাও চালুর আবেদন করা হয়েছে।
৮. নোটিশ ও শুনানি ছাড়া নাম বাদ দেওয়া যাবে না
আইন অনুযায়ী নোটিশ দেওয়া এবং শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ না দিয়ে কোনো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ না দেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, পাঞ্জাবসহ যেসব রাজ্যে নির্বাচন সামনে রয়েছে, সেখানে আইন নির্ধারিত শেষ তারিখ পর্যন্ত যোগ্য ব্যক্তিদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
৯. এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত করতে হবে
আবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব রাজ্যে চলমান এসআইআর স্থগিত রাখার জন্য অন্তর্বর্তী নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। যোগ্য ভোটারদের অধিকার রক্ষা এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য এ দাবি জানানো হয়েছে।
১০. আদালতের বিবেচনায় প্রয়োজনীয় অন্য নির্দেশ
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখা এবং প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অন্য নির্দেশ দেওয়ার জন্যও আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। মামলার পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত যে অতিরিক্ত নির্দেশ উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় মনে করবেন, তা দেওয়ার অনুরোধ রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
এমআরএইচ/
