জ্বালানি সংকট, ব্যাংকের উচ্চ সুদহার ও নীতিগত জটিলতায় ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস ও বন্ড অফিসের নানা জটিলতা। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শ্রম আইনে আনা সংশোধনীও শিল্পের সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এ অবস্থায় শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নীতিগত জটিলতা নিরসনে গুরুত্ব দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন হ্যামস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আয়োজনে এসব কথা বলেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, সবুজ কারখানা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৩০০টি কারখানা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। লিড (LEED) সনদপ্রাপ্ত প্ল্যাটিনাম কারখানার সংখ্যা ও সর্বোচ্চ স্কোরের দিক থেকেও বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। হ্যামস গ্রুপের চারটি কারখানার মধ্যে তিনটি লিড সনদপ্রাপ্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রুপটির হ্যামস গার্মেন্টস (নিট কম্পোজিট) ১১০-এর মধ্যে ১০৮ স্কোর অর্জন করেছে, এটিই বিশ্বে সর্বোচ্চ।
সবুজ কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি কেবল গাছপালা দিয়ে কারখানা সাজানোর বিষয় নয়। এর মূল লক্ষ্য জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস করা। পাশাপাশি পানি পুনর্ব্যবহার ও পুনরায় ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জ্বালানি ব্যবহার যত বাড়বে, কার্বন নিঃসরণও তত বাড়বে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ক্ষেত্রে কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে সবুজ কারখানার অগ্রগতির পাশাপাশি শিল্পের জন্য জ্বালানি সংকটকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন হ্যামস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় নীতিগত জটিলতার কারণে বাংলাদেশ এতদিন সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রত্যাশিত সুফল নিতে পারেনি। তবে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজের ওপর থেকে ভ্যাট ও কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) হিসাব অনুযায়ী, দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, কর অব্যাহতির সিদ্ধান্ত এ লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। তবে সৌরবিদ্যুৎ থেকে দিনে গড়ে চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। তাই দিনের এই সময়ের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বাকি সময়ের জ্বালানি চাহিদা নিশ্চিত করাও জরুরি। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের টেকসই উন্নয়নে সামগ্রিক জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
জ্বালানি সাশ্রয়ে কারখানা পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রচলিত কনভেনশনাল মোটর ব্যবহার ছেড়ে আধুনিক মোটর ব্যবহার হচ্ছে।পাশাপাশি কারখানায় বিএলডিসি ফ্যানসহ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি খরচ কমানোর চেষ্টা চলছে।
শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে আসার পেছনে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকের উচ্চ সুদহারকে দায়ী করেন তিনি। এ ছাড়া এনবিআর, কাস্টমস ও বন্ড অফিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জটিলতা উদ্যোক্তাদের প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
শ্রম আইনের সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শফিকুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আনা সংশোধনী শিল্পের সক্ষমতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এ সংশোধনীর কারণে তৈরি পোশাক খাতের ৫০ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ ধীরে ধীরে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি সরকারকে গভীরভাবে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হ্যামস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সামনে কপ ৩১ জলবায়ু সম্মেলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রতিবছর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন চুক্তি হলেও কার্বন নিঃসরণে বেশি দায়ী উন্নত দেশগুলো দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সেসব চুক্তির বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখছে না। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থান ধরে রাখতে জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতিগত জটিলতা নিরসন ও শিল্পের টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন শফিকুর রহমান।
