শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বাদ জুমা বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তরুণ প্রকৌশলী আরিফ শাহরিয়ারের (২২)। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে আয়োজন করা হয়েছিল বউভাতের অনুষ্ঠান। দুই বাড়িতে চলছিল বিয়ের প্রস্তুতি, সাজানো হয়েছিল আলোকসজ্জা ও বরণদ্বার, বিলি করা হয়েছিল দাওয়াতপত্র। কিন্তু বিয়ের আগের দিন বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান আরিফ। আনন্দের আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের মাতমে। বিয়ের দিনে বরকে সাজিয়ে তোলার বদলে স্বজনদের আয়োজন করতে হয় তাঁর জানাজা।
আরিফ গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানিপাড়ার বাসিন্দা। কনের বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় এলাকায়। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবার ও এলাকাবাসী জানান, আরিফ সম্প্রতি ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। বিয়ের জন্য প্রায় এক মাস আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন। দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর থেকেই দুই পরিবারে চলছিল নানা আয়োজন। কনের বাড়ির ফটক ও ঘর সাজানো হয়েছিল বর বরণের জন্য।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাতে আরিফের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। অথচ ওই সময় তাঁর নিথর দেহ রাখা ছিল গাইবান্ধা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের কফিনে। ডেভিড কোম্পানিপাড়ায় অবস্থিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির পরিচালক কায়সার প্লাবন বলেন, শনিবার দুপুরে কমিউনিটি সেন্টারে বউভাতের আয়োজন ছিল। সবকিছু নিমেষেই পণ্ড হয়ে গেল।
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ পরিবারের: আরিফ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে ধারণা তাঁর পরিবারের। তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন আরিফের একমাত্র বড় বোন শারমিন সুলতানা। তাঁর অভিযোগ, গাইবান্ধা শহরের হাসপাতাল রোডের একটি রোগনির্ণয়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁর ভাইকে। পরে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও তাঁকে প্রায় এক ঘণ্টা রিকশায় বসে থাকতে হয়।
শারমিন জানান, চার দিন আগে আরিফ জ্বরে আক্রান্ত হন। শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে বৃহস্পতিবার সকাল নয়টার দিকে তাঁকে হাসপাতাল রোডের একটি রোগনির্ণয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বেলা একটার দিকে একজন চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেন। ওষুধ নিয়ে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।
বিকেলে আরিফের শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারমিনের অভিযোগ, জরুরি বিভাগের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা তাঁকে রিকশায় বসে থাকতে হয়। পরে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাঁকে পরীক্ষা করেন। রাত পৌনে আটটার দিকে চিকিৎসক আরিফকে মৃত ঘোষণা করেন।
গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল হুদা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। শুক্রবার সকালে পরিবারের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ওই দিন দুপুরে আরিফের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। বৃহস্পতিবার রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। তবে ঠিক কী কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা জানা যায়নি।
চিকিৎসকদের বক্তব্য: হাসপাতাল রোডের মাইশা রোগনির্ণয়কেন্দ্রের পরিচালক কাইয়ুম মিয়া জানান, আরিফ শাহরিয়ার তাঁর পরিচিত ছিলেন। শুক্রবার দুপুরে নিজের বিয়ের দাওয়াতও তাঁকে দিয়েছিলেন আরিফ। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁকে ওই রোগনির্ণয়কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য আনা হয়।
কাইয়ুম মিয়ার ভাষ্য, চিকিৎসক মনির হোসেন আরিফকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি না করে বাড়িতে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যায় তাঁকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে বৃহস্পতিবার রাতে দায়িত্ব পালন করেন চিকিৎসক মেহেদী হাসান। শুক্রবার সকালে তিনি জানান, আরিফকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর ভাষ্য, সাধারণত জ্বরে হঠাৎ করে মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যাশিত নয়। স্বজনদের বর্ণনা ও আগের পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে তাঁর ধারণা, আরিফ কয়েক দিন ধরে টাইফয়েডে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর ডেঙ্গুর উপসর্গ ছিল না। সম্ভবত স্ট্রোক অথবা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
তবে চিকিৎসকের এই বক্তব্যে আরিফের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হয়নি। এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চিকিৎসাগত প্রতিবেদন বা পরীক্ষার ফলাফলের তথ্য পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার বাদ জুমা গাইবান্ধা শহরের রেলস্টেশন জামে মসজিদে আরিফ শাহরিয়ারের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে শহরের পৌর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। যে দিনে নতুন জীবনের সূচনা হওয়ার কথা ছিল, সেই দিনেই তরুণ প্রকৌশলীর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ায় দুই পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
সানা/আপ্র/কেএমএএ/১৬/১০/২০২৬
