শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অচল চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নতুন ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম যোগদানের ১৭ দিন পর প্রথমবারের মতো নিজের কার্যালয়ে গেছেন।
সাদিক কায়েমের সংহতি প্রকাশ
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অচল চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নতুন ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম যোগদানের ১৭ দিন পর প্রথমবারের মতো নিজের কার্যালয়ে গেছেন। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে অফিস সময় শুরুর আগেই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে তিনি প্রশাসনিক ভবনে নিজের কার্যালয়ে বসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন নেতাকেও দেখা যায়।
তবে ভিসি কার্যালয়ে প্রবেশকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাঁদের দেওয়া তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন নতুন ভিসি। অন্যদিকে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের দাবি, প্রশাসনিক ভবনের তালা শিক্ষার্থীরাই খুলে দিয়েছেন। চুয়েট শাখা ছাত্রদলের নেতারা দাবি করেছেন, ভবনের কর্মচারীরা তালা খুলেছেন।
এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ভিসি ভবনের সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁরা নতুন ভিসিকে বেলা ১২টার মধ্যে কার্যালয় ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি বেরিয়ে না আসায় বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ভিসি ভবনের নিচের ফটকে আবারও তালা ঝুলিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। তখন ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম এবং চুয়েট শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা ভবনের ভেতরে অবস্থান করছিলেন।
এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘আমাদের দাবি, আমাদের দাবি, মানতে হবে, মানতে হবে’ এবং ‘প্রত্যাখ্যান, প্রত্যাখ্যান, নতুন ভিসি প্রত্যাখ্যান’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই নতুন ভিসির কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়া এবং পরে ভবনে তালা দেওয়ার ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তালা ভেঙে প্রবেশ : আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে নতুন ভিসি নিয়োগের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তাঁরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। এরপর থেকে তাঁরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন। সোমবার সকালে নতুন উপাচার্য সেই তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন বলে তাঁদের অভিযোগ।
এক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী বলেন, ভিসি আমাদের দেওয়া তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছেন। আমরা তাঁকে আলটিমেটাম দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি শোনেননি। তাই আমরা আবারও তালা দিয়েছি।”
শিক্ষার্থীদের দাবি, নতুন ভিসি নিয়োগ তাঁরা মেনে নেননি। তাঁদের মূল দাবি, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বপদে পুনর্বহাল করা। এ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
অন্যদিকে ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেন, তিনি অফিস সময় শুরুর অনেক আগেই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক খোলা ছিল। প্রশাসনিক ভবনে তালা থাকলেও শিক্ষার্থীরাই সেটি খুলে ফেলেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভিসি বলেন, “আমি ক্যাম্পাসে এসেছি। ভিসি কার্যালয়ে অফিস করছি। বিভিন্ন বিভাগের প্রধান ও দপ্তরপ্রধানদের আমন্ত্রণ করেছি। তাঁদের সঙ্গে বসে করণীয় ঠিক করব।”
প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশের সময় তালা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি অফিস সময়ের অনেক আগেই এসেছি। তখন ক্যাম্পাসের মূল ফটক খোলা ছিল। প্রশাসনিক ভবনে তালা ছিল। ছাত্ররাই সেটা খুলে ফেলেছে।”
ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে কার্যালয়ে : প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে ভিসি ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় তাঁর সঙ্গে ছাত্রদলপন্থী বর্তমান ও সাবেক আট থেকে দশজন শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে ভিসি কার্যালয়ে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত, সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইনসহ ১০ থেকে ১৫ জন উপস্থিত হন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ বলেন, ভিসি ক্যাম্পাসে আসার খবর পেয়ে তাঁরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, “উপাচার্য ক্যাম্পাসে এসেছেন জানতে পেরে আমরা শিক্ষার্থীরা উনার সঙ্গে দেখা করতে যাই। আমরা প্রথমে শিক্ষার্থী, তারপর ছাত্রদলের নেতা।”
প্রশাসনিক ভবনের তালা খোলার বিষয়ে ওয়াসিফ রাশেদ বলেন, “প্রশাসনিক ভবনের কর্মচারীরা তালা খুলেছেন। আমরা অনেক পরে ভিসির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি।”
ভিসি ভবনের নিচে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেওয়ার পর কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে ছাত্রদল সভাপতি বলেন, ভিসি প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। এরপর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসার পরিকল্পনাও ছিল তাঁর।
ওয়াসিফ রাশেদের ভাষ্য, “একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা নিচে এলে ভিসি স্যার তাঁদের জানিয়েছিলেন, তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ শেষে নিচে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তালা দিয়ে দেয়। এখনো তালা মারা আছে।”
‘সায়েমের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক, সকালেও ফোন করেছি’ : নিজ কার্যালয়ে বসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সাবেক ভিসি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের সঙ্গে নিজের সুসম্পর্কের কথা তুলে ধরেন নতুন ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তিনি জানান, চুয়েটের উন্নয়নে দুজন একসঙ্গে কাজ করতে চান এবং সোমবার সকালে ক্যাম্পাসে আসার আগে সায়েমকে ফোনও করেছিলেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে তিনি তাঁদের দাবি জানানোর একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন বলে জানান। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের দাবি শুনে যুক্তিসংগত বিষয়গুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবেন তিনি।
ক্লাস শুরুর পরিকল্পনা, একাডেমিক পুনরুদ্ধারের আশ্বাস : দীর্ঘদিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একটি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরির কথা জানিয়েছেন নতুন উপাচার্য। তিনি বলেন, বিভাগীয় প্রধান ও দপ্তরপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ক্লাস শুরুর সময়সূচি নির্ধারণের চেষ্টা করবেন।
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে, নিয়মিত ক্লাস কীভাবে শুরু করা যায়। বিভাগীয় প্রধান ও দপ্তরপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করে খুব দ্রুতই আমরা শিডিউলটা জানিয়ে দেব।”
এদিকে রোববার ও সোমবার ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) আয়োজিত একটি সভায় তাঁর অংশ নেওয়ার কথা ছিল। ওই দুই দিনের জন্য যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. আরাফাত রহমানকে ভিসির রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে অন্য একজনকে এভাবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
আলোচনার উদ্যোগ কতটা সফল হবে? : সোমবার সকালে নতুন ভিসি ক্যাম্পাসে প্রবেশ, তালা খোলা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং পরে তাঁর কার্যালয় থাকা ভবনে শিক্ষার্থীদের ফের তালা দেওয়ার ঘটনা চুয়েটের চলমান সংকটের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
একদিকে নতুন ভিসি শিক্ষার্থীদের দাবি শোনা, শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা এবং দ্রুত ক্লাস শুরুর পরিকল্পনার কথা বলছেন। অন্যদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁর নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করে সাবেক ভিসি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে অনড় রয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম কবে ফিরবে, শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা কবে শুরু হবে এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থা কীভাবে কাটবে-তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নতুন ভিসি আলোচনার উদ্যোগ এবং আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে কোনো সমঝোতা তৈরি হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের।
সাদিক কায়েমের সংহতি : বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম। একই সঙ্গে চুয়েটের ভিসি কে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে সাদিক কায়েম বলেন, শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের কেউ চান না, তবুও ভিসির পদে বহাল থাকার চেষ্টা করছেন নিয়োগ পাওয়া বিএনপির এক নেতা। আজ সকালে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে ‘সাধারণ শিক্ষক’ পরিচয়ে ওই ভিসি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এটি ভিসির বাহাদুরি ও যোগ্যতার নমুনা।
বিবৃতিতে সাদিক কায়েম অভিযোগ করেন, গত আট মাসে নজিরবিহীনভাবে ৪৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় নেতাদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। এসব নিয়োগে যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অবরুদ্ধ ভিসি দের উদ্ধারে ত্রাণকর্তা হিসেবে ছাত্রলীগকে আসতে দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টেন্ডার ও উন্নয়নকাজে ছাত্রলীগ এবং প্রশাসনের মধ্যে ভাগবাটোয়ারার ব্যবসা চলত। এখন ছাত্রলীগের জায়গায় ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনের দারোয়ানের ভূমিকা পালন করছে। এ পরিস্থিতিতে ভিসির পদটি বিশাল লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
চুয়েটে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে সাদিক কায়েম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে। তিনি চুয়েটের ভিসি কে অপসারণের দাবি জানান।
