রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দ্বীপজেলা ভোলার যোগাযোগের প্রধান ও অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হলো নৌপথ। সাধারণ যাত্রী, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে কম খরচে যাতায়াতের প্রথম পছন্দ লঞ্চের 'ডেক' বা সাধারণ শ্রেণি। তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এই ডেক যাত্রার রয়েছে আলাদা এক আকর্ষণ। বর্তমানে ঢাকা-ভোলা ও ভোলা-ঢাকা নৌপথে চলাচল করছে আধুনিক ও সুবিশাল সব বিলাসবহুল লঞ্চ, যার নিচতলা ও দোতলার খোলা বিস্তৃত অংশটি মূলত ডেক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কেবিনের তুলনায় ডেকে যাতায়াতের খরচ অর্ধেকেরও কম হওয়ায় যাত্রীদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। লঞ্চ যাত্রায় ডেক ব্যবহার করলে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যেই ঢাকা থেকে ভোলা কিংবা ভোলা থেকে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব। নদীর হিমশীতল বাতাস ও দু'পাশের সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে ভ্রমণের পাশাপাশি পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের সাথে চাদর বা পাটি বিছিয়ে আড্ডা দেওয়ার চমৎকার সুযোগ মেলে ডেকে। যাত্রীদের অনেকেই মনে করেন, ডেকে ভ্রমণের তৃপ্তিই আলাদা।
ডেক যাত্রী জোবায়ের হোসেনের মতে, কেবিন নিরাপদ হলেও সেখানে বন্দীর মতো অনুভূত হয়, অন্যদিকে ডেকের পরিবেশটা দেখতে ঠিক একটি যৌথপরিবারের মতো। আবার মাঝে মাঝে লঞ্চ মালিকদের প্রতিযোগিতার কারণে ক্ষেত্রবিশেষে মাত্র ১০০ টাকাতেও ঢাকা যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য বড় এক স্বস্তির বিষয়।
ডেক ও কেবিনের যাত্রীদের সেবায় লঞ্চ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিও বেশ ইতিবাচক। ‘কর্ণফুলী-১৪’ লঞ্চের সুপারভাইজার মো. জাফর জানান, তারা কেবিন আর ডেক আলাদা চোখে দেখেন না। তাদের কাছে সব যাত্রীই সমান এবং সবাইকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াই তাদের মূল দায়িত্ব।
একই সুরে কথা বলেন ‘সুরভী-৮’ লঞ্চের ম্যানেজার মিজানুর রহমান। তিনি জানান, ডেকের যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই দরিদ্র, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী কিংবা অসুস্থ রোগী থাকেন। তাদের অনেকের কাছে হয়তো ভ্রমণের টাকাও থাকে না। মানবিক খাতিরে তাদের প্রায়ই বিনামূল্যে পারাপার করা হয়।
রাত গভীর হওয়ায় লঞ্চের ডেকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যাত্রা করছেন যাত্রীরা
ভোলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগঠন ‘আমরা ভোলাবাসী’-এর সদস্য ইমরান হোসাইন জানান, লঞ্চের ডেকে যাওয়া একটি পুরোনো ঐতিহ্য। এখানে গল্প আর আড্ডার মাঝে কোন ফাঁকে লঞ্চ সদরঘাট চলে যায়, তা বলতেই পারা যায় না। তার মতে, বর্তমান লঞ্চগুলোতে চেয়ারকোচ বেশি করায় ডেকের যাত্রীদের কিছুটা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
ভোলা জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি শাহীন কাদের জানান, লঞ্চে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির সুবিধা আরো বাড়ানো গেলে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা-ভোলা রুটের লঞ্চে ডেক যাত্রা সাধারণ মানুষের জন্য আরো বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠবে।
ডেকে ভ্রমণ আরো স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে যাত্রীদেরও কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন লঞ্চ ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম। তিনি জানান, ভালো জায়গা পেতে একটু আগেভাগে ঘাটে পৌঁছানো, সঙ্গে হালকা বিছানা রাখা এবং ভিড়ের মধ্যে নিজের মোবাইল ও মূল্যবান জিনিসপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বৃষ্টি বা বৈরী আবহাওয়ায় পানি ও বাতাস থেকে বাঁচতে ডেকের ভেতরের দিকের অংশ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
