ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে নিয়োগ, পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যকে নিয়মে পরিণত করেছেন সচিব মো. মশিউর রহমান খান। ফাইল আটকে রেখে প্রকাশ্য ঘুষ দাবি, চাকরি স্থায়ী করা ও পুনর্বাসনের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সুফল ভোগ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে বলির পাঠা দাবি করে বাগিয়ে নিয়েছেন পদোন্নতিও। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ডিএসসিসিতে গড়ে তুলেছেন এক অলিখিত সিন্ডিকেট, যার মূলে রয়েছেন স্বয়ং মশিউর রহমান।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে অলিখিত সিন্ডিকেট ও ঘুষ বাণিজ্য:
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে সচিব হিসেবে যোগদানের পর সংস্থার প্রশাসকের অগোচরে ও অলক্ষ্যে তিনি নিজস্ব একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন মশিউর রহমান। সেবামুখী এই সংস্থায় সাধারণ প্রশাসনিক ফাইল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত নথি এবং সাধারণ নাগরিকদের সেবার আবেদন আটকে রেখে প্রকাশ্য ঘুষ দাবি করার অভিযোগ অগণিত। চুক্তিভিত্তিক ও নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক লেনদেন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না, ফলে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থা জিম্মি হয়ে পড়েছে।
কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত রুটিন বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির মতো স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলোকেও তিনি নিয়মিত বাণিজ্য উপাদানে পরিণত করেছেন মশিউর। অনৈতিক সুবিধার বিনিময় ছাড়া কোনো বদলি বা পদায়ন সম্পন্ন হয় না। বিশেষ করে সম্প্রতি স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা কর্মচারীদের কাছ থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দপ্তরটির ৬০ জন অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটরের চাকরি স্থায়ী করার বিনিময়ে আদায় করেছেন জনপ্রতি ৩ লক্ষ টাকা হারে মোট ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। একইভাবে ২৬ জন কার্যসহকারীর চাকরি স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ২ লক্ষ টাকা করে ঘুষ গ্রহণ করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন অনিয়ম, অদক্ষতা ও দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত হওয়া কর্মচারীদের পুনর্বাসনেও তিনি অনৈতিক অর্থের খেলা খেলেছেন মশিউর। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া রাজনৈতিক ট্যাগ বসিয়ে চাকরিচ্যুতদের পদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যার বিনিময়ে জনপ্রতি ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা আদায় করার অভিযোগের তীর তার দিকে। পরবর্তীতে এদের সুবিধাজনক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়নের নাম করে অতিরিক্ত আরও ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রশাসনিক বিধিমালা ও জ্যেষ্ঠতার ক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে লঙ্ঘন করে নির্বাহী প্রকৌশলীদের অধীনস্থ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে তাঁর পছন্দের জুনিয়র কর্মকর্তাদের চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে বলে জানা যায়। এসব অনিয়মের ফলে প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে সহকর্মীদের সঙ্গে ক্রমাগত চরম উদ্ধত, রুক্ষ ও অসৌজন্যমূলক আচরণ প্রদর্শনের ফলে সংস্থায় চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, যা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।
রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন ও প্রশাসনিক কৌশলের নেপথ্যে:
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, মশিউর রহমান বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা দীর্ঘসময় ধরে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তৎকালীন শাসকদলের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন। নির্বাচনে তৎকালীন রাজনৈতিক দলকে জেতাতে তিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থার অপব্যবহার করেন এবং ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির প্রক্রিয়ায় পুলিশ ও অন্যান্য প্রশাসনিক বলয়ের সাথে সক্রিয়ভাবে সমন্বয় সাধন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মস্থলে তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক অসদাচরণ ও দুর্নীতির প্রামাণ্য রেকর্ড তৈরি হওয়ায় তিনি নিয়মমাফিক উপসচিব পদে পদোন্নতি পাননি। তৎকালীন সময়ে তাঁর পদবঞ্চিত হওয়ার কারণ ছিল শতভাগ শৃঙ্খলাজনিত ও দুর্নীতিসংক্রান্ত, যার সাথে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো সম্পর্ক ছিল না। অথচ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি কৌশল বদলে ফেলে নিজেকে বৈষম্যের শিকার এবং অতীতের ছাত্রদল সংশ্লিষ্ট হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেন। আর্থিক লেনদেন ও অনৈতিক লবিংয়ের মাধ্যমে তিনি উপসচিব পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। বর্তমানে নিজেকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী দাবি করে ফের দুর্নীতির মহাসড়কে পা দেওয়ার চেষ্টা করছেন মশিউর রহমান।
মাঠ প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ে অনিয়মের ইতিহাস:
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে যোগদানের আগেও মো: মশিউর রহমান খান বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালীন দুর্নীতি ও অপপ্রয়োগের স্পষ্ট চিহ্ন রেখে এসেছেন। পাবনায় দায়িত্ব পালনকালে রেভিনিউ ও ম্যাজিস্ট্রেসি শাখায় সার্টিফিকেট মামলা নিষ্পত্তি এবং স্থানীয় বাণিজ্যিক লাইসেন্স প্রদানে তিনি পদ্ধতিগতভাবে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করতেন। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে খাসজমি ও অর্পিত সম্পত্তি অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ব্যক্তিমালিকানায় বন্দোবস্ত কিংবা নামজারি সম্পন্ন করে দালাল চক্রের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সুনামগঞ্জের শাল্লা ও কিশোরগঞ্জের ইটনায় দায়িত্বে থাকাকালে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের সরকারি বরাদ্দ থেকে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ এবং জলমহাল ও বালুমহাল ইজারায় অবৈধ প্রভাব বিস্তার করেন। পরবর্তীতে মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে রাজস্ব ও সাধারণ শাখায় ক্ষমতার অপব্যবহার নিশ্চিত করে হাট-বাজার ইজারা প্রক্রিয়ায় সমঝোতা বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংস্থার দায়িত্বেও তাঁর এই অনৈতিক প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ে অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও মিলারদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে অবৈধ সুবিধা দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায় করতেন তিনি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেিশক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নবায়ন, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সরকারি প্রচার সংক্রান্ত দরপত্রে প্রভাব বিস্তার করে অর্থ আদায় করা হতো। পরবর্তীতে ঢাকা ওয়াসা ও মৎস্যভিটায় সংস্থাপন শাখার কেনাকাটা, ঠিকাদারি বিল অনুমোদন, কমিশন বাণিজ্য এবং দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ সরঞ্জাম ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে বিল অনুমোদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও পকেটস্থ করেন।
ডিএসসিসিতে চাপা ক্ষোভ:
মো: মশিউর রহমান খান মূলত ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এবং সুবিধাবাদী একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। তার দুর্নীতির কারণে অতীতে পদোন্নতি বঞ্চিত হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে মিথ্যা পরিচয়ে সুবিধা বাগিয়ে নিয়ে ডিএসসিসিতে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। জনস্বার্থ রক্ষা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে তাঁর অবিলম্বে অপসারণ অপরিহার্য বলে মনে করছেন ডিএসসিসির কর্মকর্তারা। মশিউরের দীর্ঘ দুর্নীতির ফিরিস্তিতে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে কর্মকর্তারা মাঝে।
ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টরা আরও জনায়, ডিএসসিসিতে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পন্ন হওয়া বা প্রক্রিয়াধীন থাকা সমস্ত চাকরি স্থায়ীকরণ, অনিয়মতান্ত্রিক পুনর্বাসন এবং উন্নয়ন প্রকল্পের চলতি দায়িত্ব বণ্টনের সমুদয় নথি অবিলম্বে স্থগিত ঘোষণা করতে হবে। এসব প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
মশিউর রহমান ও তাঁর স্ত্রী (সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব পলি আহমেদ) এবং তাদের মধ্যস্থতাকারী সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মাধ্যমে আইনানুগ ও আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরুর কঠোর নির্দেশ প্রদান করা জরুরি বলেও জানান তারা।
