বিশ্বের পর্যটননির্ভর দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। প্রতিবেশী নেপাল এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পাহাড়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে দেশটি পর্যটনকে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত করেছে।
গত মাসে ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স (টিটিডিআই) প্রকাশ করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)। এ সূচকে ১১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৮তম। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সূচকটিতে শীর্ষ তিনে রয়েছে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনের নাম। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে ৩১তম অবস্থানে রয়েছে ভারত, ৬৯তম অবস্থানে শ্রীলংকা এবং নেপালের অবস্থান ৮৬তম। প্রশ্ন হলো কেন কিছু দেশ পর্যটনে এগিয়ে থাকে আর কিছু দেশ পিছিয়ে?
এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পর্যটকের নিরাপত্তা। পর্যটক আকৃষ্ট করার মতো যথেষ্ট অবকাঠামো ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকার পরও যদি তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থেকে যায় তবে কখনই পর্যটনের বিকাশ সম্ভব না। স্থানীয়ভাবে নয়, বৈশ্বিকভাবে তো নয়ই। ঠিক এ কারণে বাংলাদেশে পর্যটন খাতের কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণ ঘটেনি। এর সাম্প্রতিক নজিরই হলো মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা।
জানা গেছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ছিল না এবং কয়েক মাস আগে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সতর্ক করা হলেও তা আমলে নেয়া হয়নি। এ ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে ৫০০-৬০০টি হোটেল-মোটেল-রিসোর্টের তথ্য থাকলেও বাস্তবে সংখ্যা আরো বেশি বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব একাধিক সংস্থার ওপর নিয়োজিত। অনেক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে, কিন্তু তাদের কার্যকর কার্যক্রম নেই।
এটিই একমাত্র ঘটনা নয়। কিছুদিন আগে রেলস্টেশন থেকে একজন জার্মান পর্যটকের ল্যাপটপ ও ক্যামেরা চুরির ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি ল্যাপটপটি উদ্ধার করে পর্যটকের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু পর্যটকের এ ভোগান্তির দায় কে নেবে? অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর দায় কে নেবে? অগ্নিকাণ্ড, চুরি-ডাকাতি ছাড়াও সাগরে ডুবে মৃত্যু, নারী পর্যটকদের হেনস্তার বহু অভিযোগ ও প্রমাণ রয়েছে। আর পর্যটন কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথে সড়কে মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে অগণিত। এমন পরিবেশে পর্যটনের বিকাশ তো দূরের কথা, নিম্নগতি ঠেকানো যাবে কিনা সেটিই বড় প্রশ্ন।
চলতি বছর বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও বিশ্বমানের শিল্পে উন্নীত করা সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার। এগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে সবার আগে পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি পর্যটককে নিরাপদে রাখা না যায় তবে যতই আধুনিক, উন্নত পর্যটন শিল্প গড়ে উঠুক না কেন পর্যটককে আকৃষ্ট করা যাবে না। বিনোদন ভ্রমণে বেরিয়ে কেউ জানমাল হারাতে চায় না। পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার পথ থেকে শুরু করে গন্তব্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বের পর্যটননির্ভর দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। প্রতিবেশী নেপাল এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পাহাড়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে দেশটি পর্যটনকে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৩ সালে নেপালের জিডিপিতে পর্যটনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান আনুমানিক ৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং এ খাত প্রায় ১১ দশমিক ৯ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বব্যাংক একই সঙ্গে বলেছে, পর্যটন দেশটির প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় খাত।
নেপালের ক্ষেত্রে পর্যটকের নিরাপত্তাকে পর্যটন ব্যবস্থাপনার আলাদা ও বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। দেশটিতে ১৯৭৯ সালে বিশেষায়িত ট্যুরিস্ট পুলিশ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ ইউনিটের কর্মকর্তাদের দায়িত্বের মধ্যে পর্যটন এলাকায় নিয়মিত টহল ও নজরদারি, পর্যটকের অভিযোগ গ্রহণ, হারানো কাগজপত্র বা সামগ্রী উদ্ধারে সহায়তা, দুর্ঘটনা বা দুর্যোগে উদ্ধার সমন্বয় এবং পর্যটকদের নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য দেয়া থাকে। কাঠমান্ডু উপত্যকা ও পোখারায় ২৪ ঘণ্টা সেবার ব্যবস্থাও রয়েছে। দেশটিতে পর্যটকদের জন্য ১১৪৪ নম্বরে টোল-ফ্রি ট্যুরিস্ট পুলিশ হটলাইন চালু আছে।
নেপাল অবশ্য পর্যটন খাতে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে এমন নয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেই বলা হয়েছে, দেশটির পর্যটন খাত এখনো তার সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে এবং অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যটকের নিরাপত্তাকে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা রয়েছে। পর্যটন পুলিশের উপস্থিতি, হটলাইন, নিয়মিত টহল এবং উদ্ধার ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যবস্থা পর্যটকের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কম নয়। কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সেন্ট মার্টিন, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনা, নদী ও হাওরভিত্তিক পর্যটন—সব মিলিয়ে দেশের পর্যটন পণ্যের বৈচিত্র্য রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মানুষের আয় ও অবসরভিত্তিক ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ায় অভ্যন্তরীণ পর্যটনের বাজারও বড় হচ্ছে। কিন্তু পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তা, পরিবহন, উদ্ধার ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানসম্মত সেবার ঘাটতির কারণে এটিকে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধিকে যদি কেবল ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু তাদের নিরাপত্তাকে বিবেচনায় না নেয়া হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এ খাত আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা মোটেও কাম্য নয়।
পর্যটন কেবল আর্থিকভাবে সম্ভাবনাময়, এমন নয়। মানুষের মনোজগতের বিনোদনের জন্যও এটি জরুরি। যে কারণে মানুষ ভ্রমণে যেতে চায়। সুতরাং নিরাপত্তাহীনতা ও অব্যবস্থাপনা, তদারকির ঘাটতি এগুলো দূর করা গেলে কক্সবাজারসহ দেশের পর্যটন গন্তব্যগুলো কেবল দেশীয় পর্যটকের আকর্ষণস্থল নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটনেরও প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
