সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ আর অস্থিরতার বিপরীতে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মানবতার বার্তা নিয়ে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত হলো বাউল গানের আসর ‘মানুষ ভজলে’। ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম জাতীয় তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে নগরীর জয়নুল উদ্যানের বধ্যভূমি প্রাঙ্গণে বাউল শিল্পীদের কণ্ঠে তার গান ও দর্শন ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত শ্রোতাদের মাঝে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় জয়নুল উদ্যানের ব্যাটবল চত্বর সংলগ্ন বধ্যভূমি প্রাঙ্গণে সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের উদ্যোগে এ আসর শুরু হয়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, এরপর রাত পর্যন্ত চলে বাউল সংগীতের এ আয়োজন। এতে এ অঞ্চলের খ্যাতনামা বাউল শিল্পীরা লালনসহ লোকজ ধারার গান পরিবেশন করেন। গানের সুরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজনস্থল।
আয়োজক ও শিল্পীদের মতে, লালনের গান কেবল সংগীতের অনুষঙ্গ নয়, মানুষের মধ্যে মানবিকতা, সম্প্রীতি ও আত্মোপলব্ধির বোধ জাগিয়ে তোলারও মাধ্যম। বর্তমান বিশ্বের দেশে দেশে, সমাজে ও পরিবারে যে অস্থিরতা ও হিংস্রতার চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে লালনের বাণী নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
আয়োজক সংগঠন সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বর্তমান বিশ্বে, দেশে দেশে, সমাজে, পরিবারে যে অস্থির হিংস্র চিত্র, তার থেকে পরিত্রাণের জন্য লালনের বাণী বড্ড বেশি প্রাসঙ্গিক। বিষয়টি অনুধাবন করেই আমরা এই আয়োজনটি করেছি। দেশীয় শুদ্ধ সহজাত সংস্কৃতি প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার কেতন উড়াতে সমাজ রূপান্তরের উদ্যোগে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
বাউল গানের আসরে অংশ নেওয়া শিল্পীরা বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও স্থানে লোকজ বাউল সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে এ সংগীতের আবেশ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। বাউল গান শুধু কুষ্টিয়া কিংবা বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বের বহু দেশেও এ সংগীত সমাদৃত। ইউনেস্কোর স্বীকৃতিও বাউল সংগীতের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে তুলে ধরেছে।
তাদের মতে, বিশ্ববিখ্যাত সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের সৃষ্টি ও দর্শন যেন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে না যায়, সেজন্য প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা ও আয়োজন। নতুন প্রজন্মের কাছে দেশীয় লোকজ সংস্কৃতিকে পরিচিত করে তুলতে এবং বাউল গানকে আরও উজ্জীবিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।
ফকির লালন সাঁই বাংলা লোকসংগীত ও বাউল দর্শনের অন্যতম প্রভাবশালী সাধক। তার গান ও দর্শনে মানবতা, আত্মঅনুসন্ধান এবং মানুষের পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তার সৃষ্টিকর্ম আজও মানুষের জীবন, সমাজ ও মানবিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন লালন সাঁই। তার মৃত্যুদিবস স্মরণে ১৭ অক্টোবর পালিত হয় জাতীয় লালন তিরোধান দিবস। এটি বাংলাদেশের ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত একটি জাতীয় দিবস। ২০২৫ সাল থেকে দিবসটি জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির ১৩৬তম তিরোধান দিবস স্মরণে ময়মনসিংহে এ বাউল গানের আসরের আয়োজন করা হয়।
‘মানুষ ভজলে’ শীর্ষক এ আসরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দর্শক-শ্রোতা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিবর্গ এবং প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের কর্মীরা।
আসরে সংগীত পরিবেশন করেন বাউল আব্দুল জব্বার, বাউল স্বদেশ তালুকদার, বাউল মো. হাফিজ উদ্দিন, বাউল আনোয়ার সরকার, বাউল জুবায়েদ হোসেন, বিল্লাল ফকির, ইমতিয়াজ আহমেদ, সাংবাদিক আওলাদ রুবেল, আনোয়ার হোসেন, শাহরিয়ার আহমেদ আশিক, মো. আকাশসহ অনেকে।
লালনের গানকে কেন্দ্র করে এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিল্পী ও আয়োজকেরা তুলে ধরেন মানবিক সমাজ গঠনে লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্ব। তাদের প্রত্যাশা, নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা ও এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে লালনের গান, দর্শন এবং দেশীয় ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের মধ্যে আরও বিস্তৃত হবে।
সাখাওয়াত সুমন/এসএইচএ
