ট্রাফিকের ব্যস্ততা, ট্রামলাইনের বাঁক, আড্ডার কোলাহল আর পুরনো বারান্দার মরচে ধরা রেলিং— এই নিয়েই শহর কলকাতা। যা কিছু চোখের সামনে নিত্যদিনের অভ্যাসে ধরা দেয়, ব্যস্ততার জেরে তার ভেতরের আসল মায়াটুকু অনেক সময়েই অনুভূতির আড়ালে চলে যায়। অথচ চেনা জিনিসকেই যদি সম্পূর্ণ আনকোরা এক চোখ দিয়ে দেখা যায়, তবে তার চেয়ে বড় চমক আর কী হতে পারে! শারদোৎসবের আবহে সেই অচেনা রূপকেই এক সুতোয় বাঁধল ‘আর্ট চালা’। অ্যান্টিকুইটি ডিসকভারিজ় ও 'দ্য প্লেটেড প্রজেক্ট'-এর যৌথ ভাবনায় উৎসবের কলকাতায় ডানা মেলল এক অভিনব শৈল্পিক অভিযাত্রা। আর সেই শিল্পকলার পথ বেয়ে শহরের পাঁচ প্রাঙ্গণ ঘুরে এলেন অভিনেতা ঋদ্ধি সেন। এ সময় শহর যেন আস্ত ক্যানভাসের। আর সেই ক্যানভাসের নানা রূপ ধরা পড়ল অভিনেতার চোখে।
দেশের নানা প্রান্তের বৈচিত্র্যময় লোকশিল্পকে পুজোমণ্ডপের আঙিনায় উপস্থাপন করাই ছিল এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। আর এই গোটা কর্মযজ্ঞকে সুচারু রূপ দিয়েছেন দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মণ্ডপসজ্জা ও আবহনির্মাণে যুক্ত থিম-শিল্পী গোপাল পোদ্দার। তাঁরই তত্ত্বাবধানে ২০/১০ ক্যানভাসে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ঘরানার লোককলা।
উত্তর থেকে দক্ষিণ, যেখানেই চোখ যায় বাহারি রঙের খেলায় মুগ্ধ ঋদ্ধিও। হাতিবাগান সর্বজনীনে যেমন বিহারের ঐতিহ্যবাহী মধুবনী ঘরানার নিখুঁত জ্যামিতিক বুননে ফ্রেমবন্দি হয়েছে উত্তর কলকাতার পুরনো মেজাজ ও প্রাণের স্পন্দন, তেমনই দমদম পার্ক তরুণ সংঘে মধ্য ভারতের বুনিয়াদি গন্ড চিত্ররীতির সূক্ষ্ম রেখায় ফুটে উঠেছে এই মহানগরের দ্রুত চলমান জীবনের রূপরেখা। আবার দক্ষিণে ৬৬ পল্লিতে মহারাষ্ট্রের উত্তর সহ্যাদ্রির আদিম ওয়ারলি শৈলীর শ্বেতশুভ্র ক্যানভাসে অনায়াসে জায়গা করে নিয়েছে সাধারণ মানুষের দিন যাপনের জলছবি।
অন্য দিকে হিন্দুস্তান পার্ক সর্বজনীনে ওড়িশার সনাতন পটচিত্রের তুলির টানে তিলোত্তমা ধরা দিয়েছে এক অসম্ভব রাজকীয় ও মার্জিত রূপে। বেহালা নূতন দলে মেদিনীপুরের পিংলার পটুয়াদের গাঢ় প্রাকৃতিক রঙের খেলায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে এ শহরের না-বলা আখ্যান ও লোকসংস্কৃতির টান।
অবাক ঋদ্ধি। তাঁর কথায়, “আমরা তো মণ্ডপে যাই মূলত প্রতিমা ও আলোর রোশনাই দেখতে। কিন্তু এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় জায়গা হল, তা আমাদের দাঁড়িয়ে ভাবাতে শেখায়। ভারতের নানা প্রান্তের প্রাচীন লোকশিল্পের হাত ধরে আমাদের চেনা কলকাতার অলিগলি, মানুষ যে এভাবে জীবন্ত হতে পারে, তা সত্যিই অভাবনীয়। ”
উৎসবের ভিড়ের মাঝে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে শিল্পের গভীরে ডুব দিতে আর কয় জন পারেন?‘আর্ট চালা’র এই প্রয়াস সাধারণ কতটা আপনি করে নেন এখন সেটাই দেখার।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।
