
স্টাফ রিপোর্টার: সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা গেলে পাঠক-দর্শকের আস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন এ খাতের অংশীজনরা। সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও মালিকপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং পেশাগত মান সমুন্নত রাখতে তারা একটি শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুসরণ, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং পাঠক-দর্শকের জন্য সহজলভ্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সংবাদমাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উপায় হতে পারে বলে তারা একমত পোষণ করেন। তারা আরও বলেন, স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নৈতিক মান বজায় রাখা গেলে পাঠক-দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।
বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়ন এবং কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণের একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো যাচাইয়ের লক্ষ্যে ধারাবাহিক আলোচনার অংশ হিসেবে আজ রোববার সিলেটে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। খুলনা ও বরিশালের পর এটি এমআরডিআই-এর বিভাগীয় মতবিনিময় সভার তৃতীয় আয়োজন, যা হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশ-এর অর্থায়নে কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভস (সিএফএলআই)-এর আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সভায় সংবাদমাধ্যমের মালিক ও প্রকাশক, সম্পাদক, সংবাদ সিদ্ধান্তগ্রহীতা, সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এমআরডিআই-এর পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (২০২৫-২০৩০)-এর অংশ হিসেবে গণমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চলমান রাখার প্রত্যাশা করেন এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান। শুরুর উপস্থাপনায় তিনি বলেন, স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত কার্যকর হবে, সংবাদমাধ্যমে বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ তত কমবে। তিনি আরও বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
“সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তার আস্থার ওপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত পাঠক, শ্রোতা, দর্শকের গণমাধ্যমের ওপর আস্থা থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবে। এই আস্থার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোকে তাদের নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে,” তিনি বলেন। তিনি সাংবাদিকদের পাশাপাশি সম্পাদক ও মালিকদের জন্যও পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ সরকার ও আমলাদের সরকারি বিজ্ঞাপনের হার সামান্য বাড়ানো বা ছোটখাটো বিধি সংশোধনের মতো লঘু পরিবর্তন বেছে বেছে বাস্তবায়ন এবং মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন উপেক্ষা করার প্রবণতার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো দেশজুড়ে সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে এবং এগুলো তাদের সম্মিলিত ঐকমত্যের প্রতিফলন। ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ কিংবা এমনকি ৫০ শতাংশ আংশিক বাস্তবায়নে সংবাদমাধ্যম শিল্পের গভীর সংকট ও বিশৃঙ্খলার সমাধান হবে না। আমরা আংশিক ছাড়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারি না; সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে ১০০ শতাংশ সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে আমাদের অটল থাকতে হবে।”
অংশগ্রহণকারীরা একমত হন, টেকসই স্ব-নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার, মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক পক্ষের চাপ প্রতিরোধে সক্ষম শক্তিশালী ও স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন, নৈতিক সাংবাদিকতাকে আর্থিক নিরাপত্তা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। তারা মালিকপক্ষের প্রতি সময়মতো বেতন, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সিলেট মতবিনিময় সভায় চ্যানেল এসের পরিচালক, নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, রেজোয়ানুল হক রাজা বলেন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাংবাদিকদের ন্যূনতম পেশাদারিত্বের মানদণ্ড এবং নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, “যে সংবাদমাধ্যম কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে পারবে না, তাদের বন্ধ করে দিতে হবে; এটা খুবই জরুরি। আপনি যদি বেতন-ভাতা না দেন, তাহলে আপনি সাংবাদিকদেরকে কোন দিকে ঠেলে দিচ্ছেনÑঅন্য উপায়ে ইনকাম করতে বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের দিকে আপনি ঠেলে দিচ্ছেন। আপনি সেটা করতে পারেন না। অপসাংবাদিকতা বন্ধ করতে হলে সাংবাদিকদের একটা ন্যূনতম যোগ্যতা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রতিটি হাউজে নিজস্ব আচরণবিধি চর্চা করতে হবে।”
অংশগ্রহণকারীরা একই সঙ্গে বলেন, স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনা ও নীতিগত উদ্যোগে ঢাকার বাইরের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদমাধ্যমের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই স্ব-নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন বলে তারা মত দেন।
আলোচনায় আরও অংশ নেন সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি ও দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস উন নূর, দৈনিক আগামীর সময় সিলেট ব্যুরোর আবাসিক সম্পাদক আহমেদ নূর, দৈনিক উত্তরপূর্ব’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফখরুল ইসলাম, দৈনিক শ্যামল সিলেটের নির্বাহী সম্পাদক আবদুল মুকিত, দৈনিক দেশবার্তার আঞ্চলিক সম্পাদক লিয়াকত শাহ ফরিদী, সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন সভাপতি মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বদর, ইমজা সভাপতি মাহবুবুর রহমান রিপন, দৈনিক যুগভেরীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক অপূর্ব শর্মা, দৈনিক আধুনিক কাগজ সম্পাদক মঈন উদ্দিন, দৈনিক সিলেটের মানচিত্রর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফয়সল আহমদ বাবলু, সিলেট প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, বাংলা নিউজের সিলেট প্রতিনিধ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, হবিগঞ্জের প্রতিদিনের বাণী সম্পাদক মাহাম্মদ শাবান মিয়া, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর সহযোগী সম্পাদক এনাম আহমদ, দৈনিক প্রভাকর প্রধান সম্পাদক শোয়েব চৌধুরী, আইডিয়া নির্বাহী পরিচালক নাজমুল হক, সিলেট যুব একাডেমির নির্বাহী পরিচালক এ এইচ এম ফয়সাল আহমেদ, শাবিপ্রবির অধ্যাপক ড. জায়েদা শারমিন, ড. খালিদুর রহমান এবং ইফোর্টস ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (ইরা)’র প্রধান উপদেষ্টা ড. সাইকী ইসলাম।
