নবীগঞ্জ, ২৫ অক্টোবর: আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বিদায়ের করুণ সুরে শেষ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোক থেকে বিদায় নিয়েছেন দেবী।
আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে দর্পণ-বিসর্জন ও সিঁদুর খেলার মাধ্যমে ভক্তরা দেবীকে বিদায় জানান। পরে বিকাল থেকে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়াই বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এসব প্রবৃত্তি ত্যাগ করে পরস্পরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য।
গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে চণ্ডীপাঠ, বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে আনন্দময়ীর আগমনে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। পরবর্তী পাঁচদিন সারা দেশের পূজামণ্ডপগুলোতে পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব শেষ হয়। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা মর্ত্যলোকের বাবার বাড়ি থেকে স্বর্গলোকের কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফিরে যান। আগামী বছর শরৎকালে তিনি পুনরায় ধরণীতে ফিরে আসবেন।
ঐদিন দুপুর থেকে সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে বের হয় বর্ণাঢ্য বিজয়ী শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা ও বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা নবীগঞ্জ-ইনাতগঞ্জ সড়কের মাধবপুর পিংলি নদীর মোহনায় বিসর্জনঘাটে জড়ো হন। পরে ট্রাকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রাটি গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেয়।
ঢাকের বাদ্য আর বিদায়ের করুণ ছায়ায় সারিবদ্ধভাবে একে একে পিংলি নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। একই সময়ে বিজনা ও কুশিয়ারা নদীতেও চলে বিসর্জন। বিসর্জন ঘিরে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সড়কে পুলিশ এবং দায়িত্ব পালন করে ফায়ার সার্ভিসের টিমও।
নবীগঞ্জ পিংলি নদীর ঘাটে মূর্তি বিসর্জনের সময় উপস্থিত ছিলেন নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেবরায়, থানার অফিসার ইনচার্জ আবুল হোসেন, নবীগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রঙ্গলাল রায়, ইসকনের ক্রাইসিস কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য যুবরাজ গোপ, নবীগঞ্জ উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি উত্তম কুমার পাল হিমেল, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নীলকণ্ঠ দাশ সামন্ত নন্টী, নবীগঞ্জ পৌরসভা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মৃণাল কান্তি রায় মিনু, সাধারণ সম্পাদক বিভু আচার্য্য, হিরামিয়া গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রদীপ কুমার দাশ, পজিপ কর্মকর্তা শাকিল আহমদ, করগাঁও ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহিদ, ইউপি সদস্য সুজিত দাশ, পূজা উদযাপন পরিষদের সাংগঠনিক সুকান্ত দাশ, সুবিনয় দাশ মনিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
নবীগঞ্জের অধিকাংশ মণ্ডপের মূর্তি বিসর্জন হলেও নবীগঞ্জ কেন্দ্রীয় গোবিন্দ জিউর মন্দির, লোকনাথ মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থায়ী মন্দিরে পূজার ঘটসহ অন্যান্য উপাচার বিসর্জন দিয়ে মূর্তি রেখে দেওয়া হয়।
প্রথা অনুযায়ী, বিসর্জনের পর সেখান থেকে জল (শান্তিজল) এনে মঙ্গলঘটে রাখা হয় এবং সেটি হৃদয়ে ধারণ করা হয়। আগামী বছর এই শান্তিজল আবার হৃদয় থেকে ঘটে এবং ঘট থেকে প্রতিমায় রেখে পূজা করা হবে। এরপর প্রতিটি মণ্ডপে ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করেন ও মিষ্টিমুখ করেন।
উৎসব নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পাশাপাশি প্রতিটি পূজা উদযাপন কমিটিও নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। মণ্ডপে মণ্ডপে বসানো হয় সিসিটিভি ক্যামেরা এবং পাহারার জন্য গঠন করা হয় স্বেচ্ছাসেবক কমিটি। বুধবার রাতে শান্তিজল প্রদানে পৌরোহিত্য করেন যাদু ভট্টাচার্য্য ও সুজন ভট্টাচার্য্য। পূজায় চণ্ডীপাঠ করেন রজত কান্তি গোস্বামী।
নবীগঞ্জ গোবিন্দ জিউর মন্দির দুর্গাপূজা কমিটির সভাপতি প্রণব চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সম্পাদক লিটন দেবনাথের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রঙ্গলাল রায়, সহসভাপতি বিকাশ রায়, গৌতম রায়, উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমার পাল হিমেল, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নীলকণ্ঠ দাশ সামন্ত নন্টী, পৌরসভা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিভু আচার্য্য, বাদল কৃষ্ণ বনিক, মৃদুল কান্তি রায় প্রমুখ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গোবিন্দ জিউর মন্দির কমিটির সাবেক সভাপতি সুবিনয় কর, আখড়া পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোকন দাশগুপ্ত, প্রজেশ রায় নিতন, পবিত্র বনিক, উত্তম কুমার রায়, কাঞ্চন বনিক, সুব্রত কুমার দাশসহ সহস্রাধিক ভক্তবৃন্দ।
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষকেও একত্রিত করে, যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
