পাখির গান শুনতে আমাদের ভালো লাগে। তবে পাখি আমাদের মন ভালো করার জন্য গান গায় না। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, সঙ্গী খুঁজে পাওয়া এবং টিকে থাকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় পাখির সংখ্যা কমে গেলে নতুন প্রজন্মের পাখিরা অনেক সময় ঠিকমতো গান শিখতে পারে না। এতে এদের সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং অন্য পাখির সাহায্যে হারিয়ে যাওয়া গান ফিরিয়ে আনার আশা দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের একটি পার্কে একদিন বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে শুনলেন, একটি পাখি এমন একটি সুরে ডাকছে, যা ওই এলাকার রুফাস-কলার্ড স্প্যারো পাখিরা ষাটের দশকে গাইত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই সুর আর শোনা যাচ্ছিল না। বিজ্ঞানীরা পুরোনো নথি থেকে সুরটি কম্পিউটারের সাহায্যে আবার তৈরি করেন। এরপর তাঁরা দেখতে চাইলেন, পাখিরা কৃত্রিমভাবে তৈরি এই সুর শুনে তা অনুকরণ করতে পারে কি না। তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে ওই এলাকার একটি পাখি সুরটির কিছু অংশ গাইতে শুরু করে!
পাখির জন্য গান এত গুরুত্বপূর্ণ কেন
পাখির গান শুনতে সহজ মনে হতে পারে। এর পেছনে আছে শেখা, অনুশীলন আর পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গল্প। কোনো পুরুষ পাখি যদি সুন্দরভাবে পরিচিত সুরে গান গাইতে পারে, তাহলে এটির সঙ্গী পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। নিজের এলাকা রক্ষা করতেও গান কাজে লাগে। আবার কোনো পাখির গান যদি জটিল হয় এবং পাখিটি যদি তা ধারাবাহিকভাবে ভালোভাবে গাইতে পারে, তবে সেটি এর সুস্থতারও ইঙ্গিত দিতে পারে। কারণ, এমন গান গাইতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়।
কিন্তু কোনো প্রজাতির পাখির সংখ্যা কমে গেলে নতুন প্রজন্মের পাখিদের গান শেখার সুযোগও কমে যায়। সাধারণত এরা নিজেদের প্রজাতির অন্য পাখির কাছ থেকে গান শেখে। বাবা পাখি কিংবা আশপাশের পাখিদের গান শুনে শুনে এরা নিজেদের এলাকার বিশেষ সুর বা ‘উপভাষা’ রপ্ত করে। এই উপভাষা একেক এলাকায় একেক রকম হতে পারে। অন্য প্রজাতির গান ভুল করে শিখে ফেললে কিংবা অস্বাভাবিক সুরে ডাকতে শুরু করলে সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
পাখিদের গান শেখার সময়ও একেক প্রজাতির ক্ষেত্রে একেক রকম। কোনো পাখি মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গান শেখে, আবার কোনো প্রজাতি সারা জীবন ধরে নতুন সুর রপ্ত করতে পারে। কিছু পাখি জন্মগতভাবেই গানের নির্দিষ্ট কিছু উপাদান জানে। এরা সেগুলো কীভাবে সাজিয়ে পূর্ণাঙ্গ গান তৈরি করতে হয়, তা অন্য পাখির কাছ থেকে শেখে।

পুরোনো সুর ফিরিয়ে আনার চেষ্টা
ইউনিভার্সিটি অব বুয়েনস এইরেসের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল বি মিন্ডলিন রুফাস-কলার্ড স্প্যারোর হারিয়ে যাওয়া সুর নিয়ে গবেষণা করেছেন। ষাটের দশকে পাখিদের গানের যে হাতে আঁকা নোটেশন তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর সাহায্যে তিনি পুরোনো সুরটি পুনর্নির্মাণ করেন। পাখিটির গানে সাধারণত দুটি অংশ থাকে। একটি অংশ একই এলাকার পাখিদের মধ্যে প্রায় একই রকম থাকে, অন্য অংশটি পাখিভেদে বদলে যায়। পুরোনো নথিতে থাকা কিছু সুর এখনো ওই এলাকার পাখিরা গায়, কিন্তু কিছু সুর হারিয়ে গেছে।
ঠিক কেন সুরটি হারিয়ে গিয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে পার্কটিতে পাখির সংখ্যা কমে গিয়েছিল। সময়ের সঙ্গে পাখির গান এমনিতেও বদলে যেতে পারে। গান শেখার সময় কোনো পাখি ভুল করলে সেই ভুল পরবর্তী প্রজন্মের গানেও থেকে যেতে পারে। মানুষের বসতি বিস্তার এবং পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণেও এদের গানে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
মিন্ডলিনের মতে, জীববৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলার সময় আমরা সাধারণত প্রাণীদের জিনগত বৈচিত্র্যের কথা ভাবি। কিন্তু পাখির গানসহ এদের শেখা আচরণ ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও একটি জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো প্রজাতির টিকে থাকার জন্য এসব বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করাও প্রয়োজন।
আট বছর পর স্বাভাবিক হলো পাখির গান
পাখির গান আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব প্লাইমাউথের প্রাণী আচরণবিষয়ক অধ্যাপক সারা কলিন্স। তিনি ডেভন থেকে কর্নওয়ালে স্থানান্তর করা সার্ল বান্টিং নামের একদল পাখির ওপর গবেষণা করেন। সংরক্ষণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে পাখিগুলোকে নতুন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
শুরুতে পাখিগুলোর গান ছিল অস্বাভাবিক। সুরগুলো শোনাত চিকন ও ধীর, আর ডেভনের পাখিদের গানের তুলনায় বৈচিত্র্যও ছিল অনেক কম। কলিন্সের ভাষায়, এদের গানে ধ্বনির সেই সমৃদ্ধি ছিল না। তবে আট বছর পর দেখা গেল, তাদের গান আবার আগের মতো হয়ে উঠেছে।
কয়েকটি ছানাকে সার্ল বান্টিং পাখির গানের রেকর্ডিং শোনানো হয়েছিল, যদিও সব ছানাকে নয়। গবেষণাটি থেকে বোঝা যায়, পাখির হারিয়ে যাওয়া গান ফিরে আসা সম্ভব। তবে অন্য প্রজাতির পাখিরাও একইভাবে স্বাভাবিক গানে ফিরতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সার্ল বান্টিং পাখিরা জন্মগতভাবেই গানের বিভিন্ন ‘নোট’ বা সুরের উপাদান সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নিয়ে জন্মায়। উপাদানগুলো কীভাবে সাজিয়ে পূর্ণাঙ্গ গান তৈরি করতে হয়, তা এরা শেখে। যেসব প্রজাতির মধ্যে এমন জন্মগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তারাও হয়তো সহজে নিজেদের গান ফিরে পেতে পারে। তবে যেসব পাখির গান শেখার পদ্ধতি আলাদা, তাদের ক্ষেত্রে অন্য পাখির সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে।
এআই কি গানের শিক্ষক হতে পারে
অস্ট্রেলিয়ায় আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, অন্য পাখির কাছ থেকে গান শেখা কতটা কার্যকর হতে পারে। সেখানে রিজেন্ট হানিইটার নামের মহাবিপন্ন এক প্রজাতির বুনো পাখির সংখ্যা কমে প্রায় ২৫০-তে নেমে এসেছিল। তাদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য চিড়িয়াখানায় ছানা ফোটানো হচ্ছিল। কিন্তু চিড়িয়াখানায় জন্ম নেওয়া পাখিগুলোকে বুনো পাখির মতো গান শেখানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
গবেষকেরা দেখলেন, বুনো পরিবেশে জন্ম নেওয়া মাত্র দুটি পুরুষ পাখির সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেয়েই চিড়িয়াখানায় জন্ম নেওয়া পাখিগুলো নিজেদের প্রজাতির স্বাভাবিক গান শিখতে পারে। পরে সেই গান শেখা পুরুষ পাখিরাই পরবর্তী প্রজন্মের পাখিদের গান শেখাতে সাহায্য করে।
এ থেকে বোঝা যায়, শুধু রেকর্ড করা গান শুনলেই সব পাখি ভালোভাবে গান শিখতে পারে না। তাদের অনেক সময় অন্য পাখির সঙ্গে সরাসরি মেলামেশার প্রয়োজন হয়। তবে বিপন্ন প্রজাতির বুনো পাখিদের ধরে এনে খাঁচায় রাখা ছানাদের গান শেখাতে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। এতে পাখিদের মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে, রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এমনিতেই কমে যাওয়া পাখির সংখ্যা আরও বিপদের মুখে পড়তে পারে।
এখানেই এআইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পুরোনো গান পুনর্নির্মাণ করে পাখিদের শোনানো যেতে পারে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির সাহায্যে এমন ব্যবস্থাও তৈরি হতে পারে, যা পাখিদের গান শেখানোর জন্য আরও কার্যকর উপায় বের করবে। তবে কৃত্রিম সুর শুনিয়ে দেওয়া আর জীবন্ত কোনো পাখির কাছ থেকে গান শেখা এক বিষয় নয়। তাই এআই কতটা কার্যকর হবে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
শুধু গান জানলেই হবে না, চিনতে হবে এলাকার সুরও
পাখির গান শেখার ক্ষেত্রে শুধু সঠিক সুর জানা যথেষ্ট নয়। যে এলাকায় পাখিকে ছেড়ে দেওয়া হবে, সেই এলাকার পাখিদের গানের ধরনও তার জানা থাকা দরকার। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্য এলাকার উপভাষায় গান গাওয়া পাখিরা নতুন এলাকায় নিজেদের সুর মেলাতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। তাদের সঙ্গী খুঁজে পেতেও দেরি হতে পারে।
তাই কোনো পাখিকে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আগে নতুন এলাকার পাখিদের গান শোনানো কাজে লাগতে পারে। এতে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
এখন পাখিপ্রেমী ও গবেষকেরা নানা জায়গা থেকে পাখির গান রেকর্ড করে তথ্যভান্ডারে জমা করছেন। এসব রেকর্ডিং ভবিষ্যতে খুবই মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। কারণ, কোনো পাখির গান একবার হারিয়ে গেলে সেটি ফিরিয়ে আনার জন্য পুরোনো রেকর্ডিংই হয়তো একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়াবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
