ঢাকের বোল তুলছেন মহিলা ঢাকিরানিজস্ব চিত্র
Published on
:
2 min read
এক কাঁধে সংসারের ভার, অন্য কাঁধে ঢাক। কারও ঘরে অভাব, কারও জীবনে স্বামী হারানোর বেদনা। তবু থেমে থাকেননি তাঁরা। উল্টে জীবনের যত না পাওয়ার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। আরামবাগের পার্বতীচকের মহিলা ঢাকিদের জীবনে এই বদলের কারিগর দিলীপ দাস। মহিলাদের কাছে ‘দিলীপ স্যার’।
দিলীপ অনেকটা ‘চক দে ইন্ডিয়া’-র কবীর খানের মতো। পেশায় আরামবাগের বিডিও অফিসের অস্থায়ী কর্মী। কিন্তু তাঁর মন-প্রাণ জুড়ে রয়েছে ঢাক। অনেকটা নেশার মতো। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিখ্যাত ঢাকি গোকুল চন্দ্র দাসই তাঁর অনুপ্রেরণা। গোকুলের মহিলা ঢাকির দল রয়েছে। দিলীপ ভাবেন, তা হলে তিনি পারবেন না কেন? ব্যস, সেই শুরু।
২০১৯-এ মাত্র চারজন মহিলাকে নিয়ে শুরু হয়েছিল মহিলা ঢাকির দলের যাত্রা। কিন্তু যেমনটা ভেবেছিলেন, তেমনটা হয়নি। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে হাতেগোনা কয়েক জনেই এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি দিলীপ। লেগে থাকলে কী না হয়! দিনে দিনে তাঁর দল আড়ে-বহরে বেড়েছে। দিলীপের উৎসাহে ধীরে ধীরে ভয় কাটিয়ে ঢাক কাঁধে তুলে নেন মহিলারা।
এখন তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয়েছে দুটি দল—পার্বতীচকের ‘কালীমাতা মহিলা ঢাকি’ এবং বলরামপুরের ‘নিউ কালীমাতা মহিলা ঢাকি’। দু’টি দলে মোট ২৪ জন ঢাকি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৮ জন মহিলা। দুর্গাপুজো থেকে কালীপুজো, লক্ষ্মীপুজো থেকে জগদ্ধাত্রী—বিভিন্ন উৎসবে তাঁদের ঢাকের আওয়াজ পৌঁছে যায় কলকাতা-সহ নানা জায়গায়।
এই ঢাকই বদলে দিয়েছে বুলটি মান্ডির জীবন। বন্যায় বাড়ি ভেঙে যাওয়ার পর সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। এখন ঢাক বাজিয়ে উপার্জনের টাকায় নিজে চায়ের দোকান দিয়েছেন। বুলটির কথায়, ‘দিলীপ স্যার আমাদের সাহস দিয়েছিলেন। এখন নিজেরা উপার্জন করতে পারছি। আমাদের মতো অন্যরাও স্বাবলম্বী হোন, এটাই চাই।’
চম্পা মল্লিকেরও গল্পটাও আলাদা নয়। মেয়ে হয়ে ঢাক বাজাবেন? দ্বিধা ছিল। প্রায় এক বছর ধরে তাঁকে বোঝান দিলীপ। তার পরে রাজি হন। লোকের কটূক্তি উপেক্ষা করে আজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঢাক বাজান চম্পা। তাঁর কথায়, ‘কেউ ভালোবেসে ১০০ টাকা বকশিশ দিলে মন ভরে যায়।’
পুজোর মরশুমে ঢাক বাজান তাঁরা। না হলে মাঠের কাজ। তাঁদের জীবনযুদ্ধের ফাঁকে ঢাকের বোল নতুন আশার সুর। দিলীপ তাঁদের হাতে শুধু ঢাক তুলে দেননি, দিয়েছেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহসও। পুজোর মণ্ডপে তাঁদের ঢাকে বাজবে উৎসবের তাল, আর সেই তালের অলক্ষ্যে থাকবে হাসি। স্বনির্ভর হয়ে ওঠার গর্ব। দিলীপ হাসছেন। তাঁর কথায়, ‘এটুকুই প্রাপ্তি।’
