আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শিল্পকারখানার ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বেড়ে যায় আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজন। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা তাই বড় সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি।
অন্যদিকে, সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা, বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে ইউরোপ।
সম্প্রতি ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসনের পর রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিকল্প সরবরাহকারীর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে বিনিয়োগ করেছে তারা। ইউরোপীয় কমিশনার ভালদিস দোমব্রোভস্কিসের মতে, এসব উদ্যোগের সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়লেও ইউরোপীয় অর্থনীতি আগের তুলনায় বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘সিকিউরিটি টু প্রসপারিটি : দ্য ম্যাক্রোইকোনমিক কেস ফর কমোডিটি সিকিউরিটি’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। এতে পণ্য সরবরাহের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতাকে টেকসই প্রবৃদ্ধির সুযোগে রূপান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয়।
সেমিনারে অংশ নেন ইউরোপীয় কমিশনার ভালদিস দোমব্রোভস্কিস, বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) গ্লোবাল অ্যাডভান্টেজ প্র্যাকটিসের গ্লোবাল লিডার অপর্ণা ভরদ্বাজ এবং ইউরোপিয়ান ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইবিআরডি) নীতি ও অংশীদারিত্ববিষয়ক ভাইস-প্রেসিডেন্ট মার্ক বোম্যান। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন আইএমএফের ইউরোপীয় বিভাগের পরিচালক মাতেউশ শ্চুরেক।
জ্বালানি নিরাপত্তায় ইউরোপের অভিজ্ঞতা
সেমিনারে দোমব্রোভস্কিস বলেন, বর্তমানের সংঘাতময় ও খণ্ডিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতির দুর্বলতাগুলো মোকাবিলা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা ইউরোপের অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট করে তুলেছিল।
তিনি বলেন, রাশিয়ার সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমাতে ২০২২ সাল থেকে ইউরোপ গ্যাসের উৎস বহুমুখী করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামোর পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে বিনিয়োগ করেছে।
দোমব্রোভস্কিসের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরোপের সবচেয়ে বড় পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহকারী দেশ নরওয়ে এবং সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র।
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইউরোপীয় অর্থনীতি এবং মূল্যস্ফীতিতে পড়লেও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি আগের তুলনায় বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে চলতি বছরের জন্য ইউরোপের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন করা হতে পারে। জ্বালানি খাতে আগে নেওয়া বিনিয়োগ এ সক্ষমতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে ইউরোপের অভিজ্ঞতা থেকে এটিও স্পষ্ট, সরবরাহের উৎস বহুমুখী করলেই আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো যায় না। বরং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিকল্প ব্যবস্থা কাজে লাগানো এবং অর্থনীতির ওপর অভিঘাত সীমিত রাখার সক্ষমতা তৈরি করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
সেমিনারের সূচনায় সঞ্চালক মাতেউশ শ্চুরেক বলেন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, খাদ্য, সেমিকন্ডাক্টর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তাকে একসময় নির্দিষ্ট খাতের সমস্যা বা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সাম্প্রতিক সংকটগুলো দেখিয়েছে, এসব পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তা দ্রুত মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থব্যবস্থা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে।
সেমিনারের মূল বক্তব্য ছিল, পণ্যের নিরাপত্তা এখন আর শুধু সরবরাহব্যবস্থা বা বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এটি সামষ্টিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কারণ, কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সংকটের সময় উৎপাদন ও আমদানি ব্যাহত করতে পারে। এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দাম, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
এ কারণে সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে শ্চুরেক সতর্ক করেন, যেকোনো মূল্যে স্থিতিস্থাপকতা অর্জন করা আইএমএফের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য লক্ষ্য নয়। অপরিকল্পিত নীতির কারণে উৎপাদন সক্ষমতার অদক্ষ পুনরাবৃত্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকৃতি এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
তার বক্তব্যের মূল দিক ছিল, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা মোকাবিলা করতে হবে ব্যয়, দক্ষতা ও উন্মুক্ত বাণিজ্যের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে। অর্থনৈতিক খণ্ডীকরণ এড়িয়ে সরবরাহের নিরাপত্তা বাড়ানোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
আইএমএফ এর সাইড ইভেন্টে ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল, নিরাপদ ও বহুমুখী পণ্য সরবরাহব্যবস্থা কীভাবে বিনিয়োগে সহায়তা করতে পারে, অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং স্থিতিস্থাপকতাকে টেকসই প্রবৃদ্ধির উৎসে পরিণত করতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা।
আলোচনায় নীতিনির্ধারক, বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও সরবরাহ ব্যবস্থাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়। বিসিজির অপর্ণা ভরদ্বাজ বৈশ্বিক বাণিজ্য, ভূ-অর্থনীতি, অর্থনৈতিক কৌশল এবং ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে কাজ করেন। বেসরকারি খাত ও ইউরোপের বাইরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর অংশগ্রহণ আলোচনায় ব্যবসা ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করে।
অন্যদিকে, ইবিআরডির মার্ক বোম্যানের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র নীতি প্রণয়ন, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা। এসব ক্ষেত্র সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদারে বিনিয়োগ ও নীতিগত সমন্বয়ের গুরুত্ব বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক।
সেমিনারের আলোচ্য বিষয় অনুযায়ী, সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ ও বহুমুখী হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আকস্মিক সংকটে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে। এতে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হতে পারে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ব্যবস্থা তৈরি হলে উৎপাদন খরচ ও পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই স্থিতিস্থাপকতা অর্জনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দক্ষতা বজায় রাখা জরুরি।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় কোথায় ঝুঁকি
বাংলাদেশের জন্য এ আলোচনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য খাতে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে দেশীয় গ্যাসের পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজন বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিতে কাতারের মতো সরবরাহকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে কোনো সরবরাহকারী দেশে উৎপাদন বা রপ্তানি ব্যাহত হলে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তখন দাম বেশি থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব একাধিক পথে অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়লে সরকারি ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে। শিল্পকারখানায় জ্বালানির ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, যা পণ্য ও সেবার দামে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। এ কারণে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু পর্যাপ্ত গ্যাস বা তেল সংগ্রহের বিষয় নয়। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন জড়িত।
ফলে ইউরোপের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, আমদানির উৎস বহুমুখী করা। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহকারী ও বাজারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে শুধু সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয়, চুক্তির শর্ত এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ও স্পট মার্কেট থেকে কেনাকাটার মধ্যে ভারসাম্য থাকলে সরবরাহের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সহজ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দেশীয় উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানিনির্ভরতার চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় জ্বালানির অপচয় কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সংকট মোকাবিলার আর্থিক সক্ষমতা তৈরি করা। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সময় আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে আগাম পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। নিম্ন আয়ের পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার ব্যবস্থাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
চতুর্থত, জ্বালানি নিরাপত্তাকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ করা। জ্বালানি আমদানি, শিল্পনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। এসব খাতের মধ্যে সমন্বয় থাকলে সরবরাহে আকস্মিক বিঘ্নের প্রভাব সীমিত রাখা সহজ হবে।
আইএমএফ’র এই সাইড ইভেন্টে উঠে আসা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়ানোর নামে অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করলে অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। কোনো দেশ সব পণ্যের উৎপাদন নিজের দেশে নিয়ে আসার চেষ্টা করলে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সুবিধা হারানোর আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সব ধরনের জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল দেশে উৎপাদনের চেষ্টা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। বরং যেসব পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেগুলোর ঝুঁকি চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোথায় দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, কোথায় বিকল্প আমদানি উৎস তৈরি করা দরকার এবং কোথায় মজুত ও অবকাঠামো উন্নয়ন বেশি কার্যকর হবে, তা ব্যয় ও সুফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।
আইএমএফের এ সেমিনারের মূল বার্তা হলো, পণ্যের নিরাপত্তাকে শুধু সংকটের সময় সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয়। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হতে পারে। ইউরোপের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জ্বালানি সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা এবং বিকল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার সুফল সংকটের সময় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ সংকটের প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বেশি দামে পণ্য কেনার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হবে।
জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি কমানো, দেশীয় উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, দক্ষ ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বিত কৌশল গড়ে তুলতে পারলে সরবরাহের অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা সহজ হবে। এতে শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই বাড়বে না, বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও শক্তিশালী হতে পারে।
এমএম/আরএম/এমএন
