আনোয়ারায় শিশু মৃত্যুর ঘটনা: ১৩ লাখ টাকায় সমঝোতা, তদন্ত কমিটির কাজ শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক, আনোয়ারা: | রবিবার ১১ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৪৯

নিহত শিশু আয়ান
আনোয়ারায় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় গুরুতর আহত মোহাম্মদ আয়ান (৮) নামের এক শিশুকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া একটি বেসরকারি হাসপাতালের ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ এনে লাশ নিয়ে ২৪ ঘণ্টা বিক্ষোভের পর অবশেষে ১৩ লাখ টাকায় সমঝোতা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোররাত চারটার দিকে সংক্ষুব্ধ পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠকের পর এই সমঝোতা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ নিহত শিশুর পক্ষে ওই শিশুটিকে ধাক্কা দেওয়া প্রাইভেট কারটির মালিক আবদুল মান্নান, স্থানীয় গিয়াস উদ্দিন, নুরুল আবছার, মোহাম্মদ কাইয়ূম; নিহত শিশুর মামা মো. সাইফুল ইসলাম, আলী আব্বাস, ইলিয়াছ; হাসপাতালের পক্ষে ম্যানেজার মোহাম্মদ ইসমাঈল, পরিচালকদের মধ্যে হারুন ইবনে গনিসহ পাঁচজন প্রতিনিধি এবং থানা পুলিশের এক সদস্য।
বৈঠকে হাসপাতালের ম্যানেজার মো. ইসমাঈল নিজের ব্যাংক হিসাব থেকে নিহত শিশুর স্বজনকে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে নগদ দুই লাখ টাকা দেন এবং আরও তিন লাখ টাকা ইসলামী ব্যাংকের একটি চেকে পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। বাকি আট লাখ টাকা পরিশোধের জন্য নিহত শিশুর স্বজনদের কাছ থেকে একটি স্ট্যাম্প নেওয়া হয়। টাকা পরিশোধে দেরি হওয়ায় উত্তেজিত স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে লাশ রেখে অবস্থানের পর বাড়িতে চলে যান বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গঠিত তদন্ত কমিটি আজ থেকে তদন্ত কাজ শুরু করবে বলে জানা গেছে।
সমঝোতার বিষয়টি স্বীকার করে নিহত শিশুর মামা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৩ লাখ টাকার চুক্তি হয়। তারা নগদ দুই লাখ টাকা দেন এবং পরবর্তীতে একটি চেক ও স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বাকি টাকাগুলো দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর আমরা লাশ বাড়িতে নিয়ে আসি এবং শুক্রবার রাত আটটার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করি।’
সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল (পিএলসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘শিশুটি যে ব্যক্তির গাড়িতে গুরুতর আহত হয়েছে, সেই ব্যক্তিও এখানে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আমাদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। টাকা না দেওয়া পর্যন্ত তারা হাসপাতাল ভাঙচুরসহ কর্মচারীদের মারধর করেন। হাসপাতাল রক্ষায় নিরুপায় হয়ে আমরা তাদের বৈআইনি দাবি মানতে বাধ্য হই। না হলে তারা সেদিন রাতে হাসপাতাল জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘দাবি করা ২০ লাখ টাকার মধ্যে ১৩ লাখ টাকায় একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। নগদ দুই লাখ টাকা দেওয়ার পরই তারা লাশ নিয়ে বাড়ি চলে যান।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষকে সেবা দিতে এসে হুমকির মুখে পড়েছি। ডাক্তার ও দায়িত্বরত কর্মীরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।’
বৈঠকে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তা এসআই মোমেন কান্তি দেব বলেন, ‘চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এনে স্বজনরা হাসপাতালে বিক্ষোভ করেছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে আপস-সমঝোতার বৈঠক হয়। নিহতের স্বজনরা কোনো আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে লিখিত স্ট্যাম্পের সমঝোতাপত্র সই করে হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে যান।’
তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. জামশেদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকায় আমরা রোববার ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করে সবার সঙ্গে কথা বলে তদন্ত কাজ শুরু করব। এরপর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেব।’
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে টাকা দাবির বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের মতে, ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের অবহেলার দায়ে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু টাকার বিনিময়ে সমঝোতা করা চিকিৎসাসেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তার জন্য একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
উল্লেখ্য: গত বুধবার বিকেল পাঁচটায় মো. আয়ান স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মান্নানের প্রাইভেট কারের ধাক্কায় মাথায় গুরুতর আহত হয়। তাৎক্ষণিক স্বজনরা তাকে সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল (পিএলসি)-এর জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আরমান প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। রাত দশটার দিকে অবস্থার অবনতি হলে স্বজনরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এরপর স্বজনরা চিকিৎসার অবহেলার অভিযোগ এনে লাশ নিয়ে সাঙ্গু ট্রমা হাসপাতালে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর চালান। পরবর্তীতে উভয় পক্ষকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সমঝোতার পর লাশ দাফন করা হয়। নিহত আয়ান সাতকানিয়ার মোহাম্মদ আরফাত এবং বটতলী ইউনিয়নের দক্ষিণ চাপাতলী সাদেক আলী তালুকদার বাড়ির কুমকুম আক্তার দম্পতির একমাত্র ছেলে। পোশাকশ্রমিক কুমকুম স্বামী বিচ্ছেদের কারণে দীর্ঘদিন ধরে দুই সন্তানকে নিয়ে বাপের বাড়িতে বসবাস করছেন।
