বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার একসময়ের দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে সড়ক যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু হয় মানুষের দুর্ভোগ। সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারে ডুবে যায় পাহাড়ি পল্লিগুলো। শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় কুপির আলোয়, অসুস্থ রোগীকে নিয়ে ছুটতে হয় দূরের উপজেলা সদরে। কৃষিপণ্য বাজারে নিতে গুনতে হয় বাড়তি পরিবহন খরচ। পর্যাপ্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পূর্ণাঙ্গ কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ভবন না থাকায় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন বাসিন্দারা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, কুরুকপাতা ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১১ হাজার ২১৬। ম্রো, ত্রিপুরা, মারমাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ পাহাড়ের ১৪২টি পাড়ায় বসবাস করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। কুরুকপাতা বাজার ও পোয়ামুহুরী পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হলেও প্রত্যন্ত পাড়াগুলোর অনেক মানুষ এখনো মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
স্থানীয় বাসিন্দা খামলাই ম্রো বলেন, সড়ক হয়েছে, কিন্তু বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছায়নি। এখনো সৌরবাতি ও কেরোসিনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিছু ঘরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উপজেলা সদরে যেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। কোথাও নদীপথে, আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মেনদন ম্রো বলেন, রাতে কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়।
পোয়ামুহুরীর অঞ্জনা ত্রিপুরা জানান, চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে অনেক সময় পুরো দিন চলে যায়। জন্মনিবন্ধনের মতো নাগরিক সেবা নিতে যাতায়াতেও এক হাজার টাকার বেশি খরচ হয়।
কুরুকপাতা ইউনিয়নের পাহাড়ি-বাঙালি বাসিন্দাদের জীবিকার বড় অংশ কৃষিনির্ভর। পাহাড়ে জুমচাষের পাশাপাশি কলা, মিষ্টিকুমড়া ও বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করেন তাঁরা। তবে পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় বাজারে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
লুংপঙ ম্রো বলেন, শহর দূরে হওয়ায় কৃষিপণ্যের দাম ঠিকমতো পাওয়া যায় না। কষ্ট করে উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে গেলেও প্রত্যাশিত আয় হয় না।
এদিকে ইউনিয়নে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দূরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেটের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম, যোগাযোগ এবং সরকারি সেবা গ্রহণেও ভোগান্তি বাড়ছে।
কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় আলীকদম সদর এলাকায় ভাড়া করা কক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে।
কুরুকপাতার উন্নয়নকাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি ও বনসংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতা। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮০ সালের ১৭ নভেম্বর মাতামুহুরী নদীর অববাহিকার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা ‘মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট’ ঘোষণা করা হয়। পরে ২০১৪ সালে ওই অঞ্চলে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের গেজেট প্রকাশিত হয়। তবে বনাঞ্চলের সীমানা, ভূমির আইনি অবস্থান এবং ইউনিয়নের ঘোষিত সীমানা নিয়ে জটিলতা থাকায় উন্নয়নকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, কুরুকপাতা ইউনিয়নের নিজস্ব কার্যালয় নেই। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কারণে বন বিভাগের আপত্তিতে ভবন নির্মাণে জটিলতা রয়েছে। এ বিষয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
তিনি আরও জানান, কুরুকপাতায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের ঘাটতি রয়েছে। এসব সুবিধা সম্প্রসারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এমএ
