Published on
:
4 min read
তৃণাঞ্জন চক্রবর্তী
১৯২৪। লন্ডনের ওয়েম্বলি পার্কে বিশেষ আয়োজন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রদর্শনী। বিশ্বের দিগ্বিদিক থেকে শিল্পীরা এসেছেন। বাসিন্দারা আসছেন, দেখছেন। সে দিনের কথা একটু আলাদা, কেননা রাজা পঞ্চম জর্জ এসেছেন, সঙ্গে রাজ পরিবারের আরও অনেক সদস্য। চারদিকে সাজোসাজো রব।
তাঁরা ঘুরতে ঘুরতে এসেছেন যেখানে, সেখানে ব্রিটিশ ভারতের শিল্পীরা হস্তশিল্প নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন কৃষ্ণনগরের যুবা মৃৎশিল্পী। তিনি হাতের কাজ দেখাতে চাইলেন। প্রিন্স আর্থারের (ডিউক অফ কোনট) মুখাবয়বের প্রতিকৃতি বানিয়ে দিলেন পাঁচ মিনিটে! সবার তাক লেগে গেল। লন্ডনের বিখ্যাত ‘ডেলি টেলিগ্রাফ’ সংবাদপত্রে তাঁকে নিয়ে লেখা বেরোল। বলা হলো তরুণ ভারতীয় মৃৎশিল্পীর অদ্ভুত ক্ষমতার কথা, যাঁর আঙুল বিদ্যুতের বেগে কাজ করে এক তাল মাটি থেকে যে কোনও শিল্পরূপ বানিয়ে ফেলতে পারে। সোনার মেডেল পেলেন তিনি।
কে তিনি, যিনি এক শতক আগে লন্ডনকে চমৎকৃত করেছিলেন? ফিরে যাই আরও একটু আগে, আনুমানিক ১৯১৫। বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল নদিয়া সফরে বেরিয়ে পৌঁছেছেন মৃৎশিল্পে খ্যাত ঘূর্ণি গ্রামে। ঘূর্ণির প্রখ্যাত মূর্তিকার সতীশচন্দ্র পাল। তাঁর ভাগ্নে গোপেশ্বর। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে মামাবাড়িতে তাঁর বেড়ে ওঠা। এবং মামার কাছে মৃৎশিল্পে হাতেখড়ি। তরুণ গোপেশ্বর এক তাল কালো মাটি থেকে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বানিয়ে ফেলল সাহেবের মুখাবয়ব। তিনি উদ্বেল হয়ে উঠলেন। গোপেশ্বরকে আখ্যা দিলেন ‘দ্য লাইটনিং স্কাল্পটর’। শিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু হলো গোপেশ্বরের। ঘূর্ণি গ্রামের সেই অখ্যাত যুবকই এক দশক বাদে লন্ডন শহরবাসী ও ব্রিটিশ রাজপরিবারকে চমকে দেন তাঁর অদ্ভুত শিল্পকলা দিয়ে |
অদম্য মনের জোরও ছিল গোপেশ্বরে পালের। সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারের কয়েক বছর পরে রানিগঞ্জের বার্ন অ্যান্ড কোম্পানি-তে পটারি ওয়ার্কসে চাকরি পান গোপেশ্বর। কিন্তু বেশি দিন থাকেননি, মনে তখন অনেক স্বপ্ন, মাসিক ২৫ টাকা বেতনের চাকরির নিরাপত্তা ছেড়ে দিলেন গোপেশ্বর, ঠিক করলেন মূর্তিকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবেন। কিছু দিন পরেই সরকারি আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ পার্সি ব্রাউনের সুপারিশে তাঁর বিলেত যাত্রা। সেখানে সকলের মন জয় করে নিলেন।
তাঁর প্রতিভা দেখে ব্রিটিশ রাজ পরিবার এতই প্রভাবিত হয় যে, তারা ইউরোপের নানা শহরে ঘুরে তাঁর প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে, সমস্ত খরচ ব্রিটিশ সরকারের। কিন্তু গোপেশ্বর সবিনয়ে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। কয়েক মাস লন্ডনে কাটান, উদ্দেশ্য শিল্পশিক্ষা। লন্ডনের বিখ্যাত মিউজ়িয়ামগুলিতে সময় কাটান, খুঁটিয়ে দেখেন ইউরোপীয় শিল্পের পদ্ধতি। চিড়িয়াখানাতেও নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাঁর এই সময়ে। বাঘ, সিংহ, মহিষ, সাপ ইত্যাদি দেখলেন, তাদের চলাফেরার ধরন নথিবদ্ধ করলেন।
এর পর তিনি গেলেন ইউরোপীয় শিল্পের পীঠস্থান ইতালিতে। সেখানে কয়েক মাস ধরে প্রস্তর ও মার্বেল শিল্পের কলা আয়ত্ত করলেন। প্রস্তর শিল্পের কোর্স করলেন। সংগ্রহ করলেন অনেক অমূল্য বই।
ইতালি থেকে দেশে ফিরে কলকাতার কুমোরটুলি অঞ্চলে সন্থালিয়া নামের এক মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর আর্থিক সাহায্যে নিজের কাজ শুরু করলেন। শুরু হলো জি পাল স্টুডিয়োর যাত্রা। তত দিনে গোপেশ্বরের জন্মগত প্রতিভার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপীয় শিক্ষা। ভারতের বিভিন্ন রাজ পরিবার থেকে তাঁর কাছে কাজের বরাত আসতে লাগল। সারা ভারতে কাজের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল।
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে দুর্গাপূজা সম্ভ্রান্ত পরিবারের চৌকাঠ ছাপিয়ে সাধারণ সমাজে ছড়িয়ে পড়ল। প্রথমে বারোয়ারি, পরে সর্বজনীন। ফলে কুমোরটুলি অঞ্চলে প্রতিমা তৈরির চাহিদা বাড়ল। গোপেশ্বর পালের স্টুডিয়োয় প্রতিমা তৈরির আর্জি এল। কিন্তু তিনি সাধারণ প্রতিমা বানানোর শিল্পী হতে চাননি, তাই এই ধরনের কাজ ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তু, ১৯৩০-এর দশকে সর্বজনীন পূজার সংখ্যা দ্রুত বাড়ল, আর তাঁর কাছে প্রতিমার আর্জি আসতেই থাকল। এ ভাবেই নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি হলো, যা বাঙালির দুর্গাপূজাকে চিরতরে পাল্টে দিলো। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি কুমোরটুলি সর্বজনীন থেকে গোপেশ্বরের কাছে প্রতিমার তৈরির কাজ এল। তিনি করবেন না, এ দিকে স্থানীয় ছেলেরাও নাছোড়বান্দা। শোনা যায়, তাদের ফিরিয়ে দিতে ৩,০০০ টাকা মজুরি চেয়ে বসেছিলেন গোপেশ্বর, তিনি নিশ্চিত ছিলেন টাকার এই পরিমাণ শুনে ছেলেরা নিজে থেকেই মানা করে দেবে।
কিন্তু কুমোরটুলি পুজোর উদ্যোক্তারা রাজি হয়ে গেলেন। ভারতখ্যাত শিল্পী গোপেশ্বর পাল প্রতিমা গড়ছেন, সে কি চাট্টিখানি কথা? কিন্তু গোপেশ্বর কাজটা নিলেন চ্যালেঞ্জের মতো। সাধারণ মূর্তি গড়ে দিয়ে দেবেন, তিনি সেই শিল্পী ছিলেনই না। সারা জীবন প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে চলা গোপেশ্বর প্রতিমা নির্মাণেও নিজের শৈলী নিয়ে এলেন।
সেই সময় অবধি একচালা প্রতিমারই চল ছিল। কিন্তু গোপেশ্বর অন্য ভাবনা ভাবলেন। ইউরোপের বিভিন্ন মিউজ়িয়ামে মূর্তি পাশাপাশি সাজিয়ে রাখার ব্যাপারটা তাঁর মনে ছিল। তাই একচালা প্রথা ভেঙে তিনি প্রতিটি মূর্তিকে আলাদা চালা দিলেন। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মূর্তি দু’টিকে একটু ছোট আকার করলেন, যাতে মা দুর্গার মেয়ে হিসেবে সামঞ্জস্য থাকে। গোপেশ্বরের সবচেয়ে সাহসী কাজ হয়তো ছিল মূর্তির চোখের ধাঁচের বদলে। সেই সময়ে অবধিও দেবী প্রতিমার চোখ টেনে আঁকা হতো। কিন্তু গোপেশ্বর সে পথে হাঁটলেন না। তিনি সাধারণ মানুষের মতো চোখ দিলেন তাঁর হাতে তৈরি প্রতিমাগুলিকে। লক্ষ্মী ও সরস্বতী মূর্তির চোখ মুখ এমন ভাবে বানালেন, যেন কোনও মানব-কিশোরীর মুখ, মা-মেয়েকে চিনতে-বুঝতে যাতে কারও অসুবিধে না হয়।
এক যুগ আগে লন্ডনের চিড়িয়াখানায় বন্যপ্রাণীর চলাফেরার যে ধরন নথিবদ্ধ করেছিলেন, তা এ বার কাজে লাগালেন গোপেশ্বর। তাঁর হাতে তৈরি সিংহ, মহিষ, সাপ যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। তাঁর তৈরি প্রতিমা যখন মণ্ডপে ঠাঁই পেল, তখন তা সকলকে সে ভাবেই চমকে দিলো, যে ভাবে তিনি প্রিন্স আর্থারকে চমকে দিয়েছিলেন মুখাবয়ব বানিয়ে।
তবে এ নিয়ে বিতর্কও কম হলো না। হিন্দু সমাজে আলোড়ন পড়ে গেল। পুরোহিতেরা এই নতুন মানবী রূপের দেবীমূর্তির পূজা করতে অস্বীকার করলেন। সেই নিয়ে বিচারসভা বসল শোভাবাজার রাজবাড়িতে। গোপেশ্বরকে ডাকা হলো। শোনা যায়, তিনি সেখানে বলেছিলেন যে, মা তো যাচ্ছেন যুদ্ধে অসুর বধ করতে, সেখানে নিশ্চয়ই সন্তান-সন্ততি নিয়ে যাবেন না, সেই কারণেই চালা আলাদা। মা আরাধ্য হবেন তাঁর যোদ্ধারূপে, আর পুত্র-কন্যা তাঁদের মতো আলাদা চালায়। অনেক তর্ক-বিতর্কের পরে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরই জিত হলো। পুরোহিতরাও রাজি হলেন পূজা করতে। আগামী দিনে গোপেশ্বরের প্রথাই ধীরে ধীরে মান্যতা পেল। সর্বজনীন পুজোয় সাবেকি একচালা ছেড়ে আলাদা আলাদা চালার ঠাকুর, মানুষের মতো প্রতিমার মুখ-চোখ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। পরের আট বছর ধরে কুমোরটুলি পূজার প্রতিমা নিজের হাতে গড়লেন গোপেশ্বর। বাঙালি সমাজে গোপেশ্বর পালের নাম অবিস্মরণীয় ভাবে জড়িয়ে পড়ল দুর্গাপূজার সঙ্গে। তবে শুধু দূর্গা মূর্তি নয়, আজ এই মহান শিল্পীর ছোঁয়া রয়ে গেছে এ রাজ্য থেকে সুদূর দিল্লিতেও। দিল্লি কালীবাড়ির কালী প্রতিমা, বেলুড় মঠে রামকৃষ্ণদেবের মূর্তি, কলকাতা হাইকোর্টে স্যর রমেশচন্দ্র মিত্রের মূর্তি, প্রখ্যাত শিল্পপতি স্যর আর এন মুখার্জির মূর্তি (বর্তমানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে রয়েছে), এ সবই গোপেশ্বর পালের হাতে তৈরি। আর রয়েছে তাঁর স্টুডিয়ো— কুমোরটুলির ৪০এ কাশী মিত্র ঘাটে স্থিত এই মহান শিল্পীর কর্মস্থল, যেখানে গেলে দেখা যাবে তাঁর গড়ে যাওয়া আরও অনেক অপূর্ব ও অমূল্য শিল্পের নিদর্শন। আমাদের দুর্গাপূজো আজ ইউনেস্কো-র ‘হেরিটেজ’ তকমা পেয়েছে। কিন্তু যে মানুষটি এই পূজার মূর্তি গড়ার প্রথাকে আমূল পাল্টে দিয়েছিলেন, তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, সেই মানুষটিকে আমরা প্রায় ভুলেই গেছি। তাই দুর্গাপুজোয় ‘প্যান্ডাল হপিং’-এর মাঝে ঘুরে আসা উচিত জি পাল অ্যান্ড সন্স নামক স্টুডিয়োয়। নিজের চোখে দেখা যায় এই মহান শিল্পীর কর্মকাণ্ড, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন শিল্পের নামে। যে দেবীকে তিনি আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আরও কাছের করে তুলেছিলেন, সেই গোপেশ্বর পালকে এ ভাবেই হয়তো সম্মান জানানো যায়।
আমাদের দুর্গাপূজো আজ ইউনেস্কো-র ‘হেরিটেজ’ তকমা পেয়েছে। কিন্তু যে মানুষটি এই পূজার মূর্তি গড়ার প্রথাকে আমূল পাল্টে দিয়েছিলেন, তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, সেই মানুষটিকে আমরা প্রায় ভুলেই গেছি। তাই দুর্গাপুজোয় ‘প্যান্ডাল হপিং’-এর মাঝে ঘুরে আসা উচিত জি পাল অ্যান্ড সন্স নামক স্টুডিয়োয়। নিজের চোখে দেখা যায় এই মহান শিল্পীর কর্মকাণ্ড, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন শিল্পের নামে। যে দেবীকে তিনি আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আরও কাছের করে তুলেছিলেন, সেই গোপেশ্বর পালকে এ ভাবেই হয়তো সম্মান জানানো যায়।
