একটি ইসরায়েলি বিজ্ঞাপন সংস্থা অনলাইনে কোটি কোটি বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। আর এই বিজ্ঞাপনগুলো লক্ষ্যবস্তু করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘জিরো-ক্লিক’ স্পাইওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য জানিয়েছে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল তদন্ত গবেষণা ইউনিট সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, তারা বিশ্বাস করে যে কাতারের সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান আল-জাজিরার কয়েক ডজন ডিভাইস ডিসকভার-টেকের চালানো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আসা স্পাইওয়্যার দিয়ে আক্রান্ত হয়েছে। ডিসকভার-টেক নিজেদেরকে একটি বিশেষায়িত ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সংস্থা হিসেবে বর্ণনা করে।
সিটিজেন ল্যাবের মতে, কন্ট্রোলিয়াম নামে একটি সফটওয়্যার ডিসকভার-টেক প্ল্যাটফর্মটি পরিচালনা করে। এটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ‘ব্যাপকভাবে প্রোফাইল তৈরি ও পরিচয় উন্মোচন’ করতে এবং তারপর তৃতীয় পক্ষের স্পাইওয়্যার দিয়ে গোপনে লক্ষ্যবস্তুকে হ্যাক করতে সাহায্য করে। যেসব সংক্রমণ লিঙ্ক বা ফাইলের সাথে মানুষের মিথস্ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে, তার থেকে ভিন্ন এই স্পাইওয়্যারটি ইনস্টল হওয়ার জন্য ভুক্তভোগীর কোনো মিথস্ক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না। ব্যবহারকারীর অজান্তেই এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এই সংক্রমণ ঘটে থাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “(অনলাইন বিজ্ঞাপনের) ইকোসিস্টেমটিকে বিশাল পরিসরে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে লাখ লাখ ব্যবহারকারীর প্রোফাইল তৈরি করা হচ্ছে এবং এরপর কোনো ধরনের ক্লিক ছাড়াই অত্যন্ত গোপনে তাদের ডিভাইসে ভাড়াটে স্পাইওয়্যার ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কন্ট্রোলিয়াম’ নামের একটি ব্যবস্থা ব্যবহারকারীর পরিচয় ও আইপি অ্যাড্রেস সংগ্রহ করতে সক্ষম। এটি ঘটে যখন ব্যবহারকারীকে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হয় এমন কোনো বিজ্ঞাপন দেখানো হয়—যেমন কোনো ডিজিটাল গেম বা টেলিকম পরিষেবার বিজ্ঞাপন। গবেষকদের মতে, যদি কোনো ব্যবহারকারীকে হ্যাকিংয়ের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্বাচন করা হয়ে থাকে, তবে ভাড়াটে স্পাইওয়্যার সরবরাহকারী কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের ডিভাইসে ক্ষতিকারক কোডযুক্ত স্পাইওয়্যার পাঠিয়ে দিতে পারে।
গবেষকদের ভাষ্যমতে, ২০২৪ সাল থেকে ডিসকভার-টেক বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ব্যবহারকারীকে বিজ্ঞাপন দেখিয়েছে; যার মধ্যে ইয়েমেন, ব্রাজিল, মেক্সিকো এবং চেক প্রজাতন্ত্রের ব্যবহারকারীরাও রয়েছেন।
গবেষক গোষ্ঠী ‘কনফিঅ্যান্ট’-এর গবেষণাতেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীদের কাছে ডিসকভার-টেক- এর বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ, ন্যাটো, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীদের কাছেও এই বিজ্ঞাপন পৌঁছেছে।
সিটিজেন ল্যাবের গবেষক উলফি ক্রিস্টল বলেন, “এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, বড় বড় বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ধরে এই কোম্পানির ক্ষতিকারক বিজ্ঞাপন কার্যক্রম শনাক্ত করতে বা তা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে অনলাইন বিজ্ঞাপনের ইকোসিস্টেম যেভাবে কাজ করে, তা রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজসহ সবার জন্যই একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি।”
সিটিজেন ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ‘কন্ট্রোলিয়াম’ তৃতীয় পক্ষের স্পাইওয়্যার কোম্পানিগুলোর জন্য একটি সহায়ক হিসেবে কাজ করে। এই কোম্পানিগুলো মূলত সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, অধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ এবং দূতাবাসের কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু বানায়। এর মাধ্যমে এমন স্পাইওয়্যার ডিভাইসে প্রবেশ করানো যায়, যা ব্যবহারকারীর ডিভাইসে থাকা সবকিছুর নাগাল পেতে পারে—যেমন বার্তা, ছবি ও ইমেইল চুরি করা, কল রেকর্ড করা এবং গোপনে মাইক্রোফোন চালু করে দেওয়া।
ডিসকভার-টেক-এর মাধ্যমে ঠিক কতজনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
সিটিজেন ল্যাবের গবেষক বিল মারজাক বলেন, “অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্যাক করা সম্ভব—এমন আলোচনা অনেকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। তবে এবারই প্রথম আমরা এমন সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত প্রমাণ পেয়েছি, যা দেখায় যে এই প্রক্রিয়াটি বাস্তবে কীভাবে কাজ করে।”
