মো. নুরুল করিম আরমান, লামা (বান্দরবান):
১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে হিন্দু ধর্মালম্বীদের বৃহত্তর ধর্মীয় উৎসব ‘দুর্গা পূজা’। এ পুজা উপলক্ষে বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় মন্ডপে মন্ডপে প্রতিমা তৈরি কাজ শেষে এখন চলছে প্যান্ডেল তৈরি, প্রতিমা সাজ সজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজ। প্রতিবছর উপজেলার একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নের ৮টি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবারে ১০ মন্ডপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ পুজা। এসব পূজামন্ডপে কারিগরদের নিপূণ হাতের ছোঁয়ায় সজ্জিত হয়েছে দেবীদুর্গা সহ অন্যান্য দেবী-দেবতা। ২১ অক্টোবর বিকালে দশমী তিথিতে মাতামুহুরী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে এ উৎসব। এবারের পূজায় কেন্দ্রীয় হরি মন্দির মন্ডপে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ‘মায়ের আরতি প্রতিযোগিতা, নাটিক, মাতৃসাজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’। দুর্গা পূজার আয়োজন নির্বিগ্নে করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে সর্বোচ্ছ নিরাপত্তা-ব্যবস্থা।
সরেজমিন পৌরসভা এলাকা ও উপজেলার কয়েকটি পূজামন্ডপ ঘুরে দেখা যায়, কাদা-মাটি, বাঁশ, খড়, সুতলি দিয়ে শৈল্পিক ছোঁয়ায় তিলতিল করে গড়ে তোলা হয় দেবীদুর্গা সহ অন্যান্য দেবী-দেবতা। সেই দেবী দেবতার মূর্তিতে রং তুলির কাজ শেষ। প্রতিমা সাজ সজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। প্রতিটি মন্ডপে প্রতিমা শিল্পীদের নিপুণ আঁচড়ে তৈরি হচ্ছে এক একটি প্রতিমা। অতি ভালোবাসায় তৈরি করা হয়েছে দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ মূর্তি। এ সময় প্রতিমা তৈরির শিল্পী সমীর পার জানায়, প্রতিমা গড়া ও রং তুলির কাজ শেষ। এখন শুধু প্রতিমাকে সাজ সজ্জার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার কাজ চলছে। কারণ ১৪ অক্টোবরের মধ্যে মন্ডপ কমিটিকে প্রতিমা বুঝিয়ে দিতে হবে। এদিকে, পূজায় দেবী দুর্গাকে বরণ করতে উদগ্রীব ভক্তরা। তাদের আয়োজনও কম নয়। বড়দের পাশাপাশি ছোটদের আনন্দ আরো বেশি। নতুন জামা-কাপড় কিনতে কাপড়ের দোকানগুলোতে ভীড় জমাচ্ছে হিন্দু ধর্মালম্বী নারী-পুরুষেরা। লামা পৌর শহরের নিউ মার্কেট থেকে কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী পূজা রাণী দত্ত বলেন, ‘দুর্গাপূজা মানেই আনন্দ, আর আনন্দের শুরু হয় নতুন পোশাক দিয়ে। সন্তানদের জন্য শাড়ি, পাঞ্জাবি আর ছোটদের জামা কিনেছি। গতবারের চেয়ে এবারে দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে, তবে উৎসব বলে না কিনে উপায় নেই।’ অরেক হিন্দু ধর্মালম্বী অলক কান্তি চৌধুরী বলেন, আমাদের ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গা পূজা। যা সাধারণত বাংলা আশ্বিন বা কার্তিক মাসে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হয়।
পূজা উদ্যাপন কমিটি সূত্রে জানা যায়, পূজাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী এমপি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাম্যচিং কে পৃষ্টপোষক করে পূজা উদ্যাপন কমিটি করা হয়। কেন্দ্রীয় হরি মন্দির কমিটিতে গোপন কান্তি চৌধুরী সভাপতি, বিধান কান্তি দাশ সাধারণ সম্পাদক ও অনুপ দাশ অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ইতিমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন মন্ডপ পরিদর্শন করেন এ কমিটির নেতারা। এছাড়া দুর্গাপুজাকে পরিপূর্ণ রুপ দিতে প্রতিটি মন্ডপে মন্ডপেও গঠন করা হয়েছে উদ্যাপন কমিটি। পুজার সার্বিক তত্বাবধানে রয়েছে লামা কো অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড, সনাতনী যুব সমাজ ও কেন্দ্রীয় গীতা সংঘ আর সহযোগিতায় রয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
লামা কেন্দ্রীয় দুর্গা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি গোপন কান্তি চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক বিধান কান্তি দাশ এক সূরে বলেন- আশা করি সকলে মিলেমিশে এ উৎসব উদ্যাপন করতে পারবো। এবারে আমাদের মন্ডপে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হবে। তিনি বলেন, প্রতিবছরের ন্যয় এবছরও পূজার জন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি মন্ডপের জন্য ৬০০ কেজি হারে খাদ্যশস্য সহযোগিতা পেয়েছি। তবে এখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দ পাইনি। একই কথা জানালেন- ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা দুর্গা মন্দির মন্ডপ, পূর্ব হায়দারনাশী সৎসঙ্গ মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার সার্বজনীন শ্রী শ্রী হরি মন্দির ও শ্রী শ্রী জগন্নাথ আশ্রম পুজা মন্ডপ, পাগলির আগা, আজিজনগর ইউনিয়নের তেলুনিয়া, মেরাখোলা ও পৌরসভার চম্পাতলী মন্ডপ কমিটির সদস্যরা। মেরাখোলা মন্ডপ কমিিিটর সভাপতি সাগর বলেন, আমাদের মন্ডপের সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। এখন সামন্য কাজ বাকী আছে। ১৪ অক্টোবর বিকেলের মধ্যে সব সাজ সজ্জার কাজ শেষ হবে। প্রতি বছরের মত এবারও শান্তিপুর্ণভাবে পুজা উদযাপন করতে পারবো বলে আশা করছি। এবারে মেরাখোলা হরি মন্দির মন্ডপে ৬ লাখ টাকার মত খরচ হতে পারে।
এদিকে সার্বজনীন লামা উপজেলা কেন্দ্রীয় দুর্গাপুজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি প্রশান্ত ভট্টাচার্য জানায়, এবার লামা পৌরসভা এলাকায় দুইটি, লামা সদর ইউনিয়নে একটি, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে ৫টি, আজিজনগর ইউনিয়নে ১টি ও ফাইতং ইউনিযনে ১টি মন্ডপে পুজা উদ্যাপিত হবে। পূজার সকল প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। পূজা সফলভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকলের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি। প্রসঙ্গত, ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ প্রথম বাংলায় সপরিবার দুর্গাপূজার প্রচলন করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বডিশার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পারিবারিক দুর্গাপূজার আয়োজন করেন।
এ বিষয়ে লামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ কাইছার হামিদ জানান, পূজা উপলক্ষে আমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। মন্ডপে পোষাকধারী ও সাদা পোষাকের পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবকরা ২৪ ঘন্টা কাজ করবেন। এছাড়া প্রতিটি মন্দিরে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মন্দির কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত আলোচনা চলছে। আশা রাখছি প্রতি বছরের মত এবারও সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে এই ধর্মীয় উৎসব সম্পন্ন হবে।
অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছরেও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় দুর্গাপুজা শান্তিপূর্ণভাবে পালন করার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মঈন উদ্দিন। তিনি বলেন, দুর্গাপুজা উপলক্ষে ইতিমধ্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি মন্ডপে বরাদ্দের পাশাপাশি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
