দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সূচনা হতে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায়ের। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর মোংলা, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সুন্দরবনের পর্যটন সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে ঐতিহাসিক সফরে মোংলায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো সরকারপ্রধান মোংলা বন্দরের উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে সরাসরি মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই কেন্দ্রমুখী সফর ঘিরে উপকূলীয় অঞ্চলের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে অভূতপূর্ব উৎসাহ ও উদ্দীপনা।
সফরসূচিতে মোংলা বন্দরের নতুন জেটি, চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সুন্দরবনের ইকোট্যুরিজম পরিদর্শনের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা ও বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, মোংলা কেন্দ্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের এই সরাসরি উপস্থিতি শুধু ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাই দূর করবে না, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দেশি-বিদেশি বড় ধরনের বিনিয়োগের আস্থার সংকট কাটিয়ে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করবে।
সফরসূচি অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে নিজ বাসভবন থেকে তেজগাঁও বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সকাল ৯টায় হেলিকপ্টারে করে সুন্দরবনের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি। ১০টা নাগাদ আকাশপথে হিরণ পয়েন্ট ও সংলগ্ন সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শন শেষে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলায় অবস্থিত নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে লঞ্চঘাটে গিয়ে নৌপথে বাগেরহাট জেলার বানৌজা মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করবেন। দুপুরে বানৌজা মোংলা জেটিতে পৌঁছে ওয়ার্ডরুমের উদ্দেশে যাত্রা করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর বিকেল ১টা ৪৫ মিনিটে ওয়ার্ডরুমের সভাকক্ষে আয়োজিত সভায় অংশ নেবেন তিনি। বিকেলে মোংলা বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম ও জেটি পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে তিনি প্রস্তাবিত বেজা ইকনোমিক জোন এলাকা ঘুরে দেখবেন। দিনব্যাপী সরকারি কর্মসূচি শেষে বিকেল ৪টায় মোংলার হেলিপ্যাড থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন তিনি এবং বিকেল ৫টায় ঢাকায় পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জানা গেছে, সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল বা ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস মোংলায় নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হবে। টার্মিনাল করার লক্ষ্য নিয়ে গত আগস্ট মাসে আকরাম পয়েন্ট এলাকা পরিদর্শন করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী, বিদ্যুৎমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। আজ বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্থানটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে স্থান নির্বাচন হলে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ অন্যান্য কাজ শুরু হবে। পরিদর্শন করবেন চায়না বিনিয়োগ ভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও। দেশের অর্থনীতিতে মোংলা বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও ইপিজেড অর্থনৈতিক জোন পরিদর্শন এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান সরাসরি মোংলা বন্দর ও এর সংলগ্ন জনপদ পরিদর্শনে আসছেন, যা স্থানীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি করেছে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা ও উৎসাহ।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জুলফিকার আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দর পরিদর্শনে এসে চীনের সাথে চুক্তি হওয়া বন্দরের নতুন জেটি নির্মাণ এলাকা পরিদর্শন করবেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই সঠিকভাবে যেন বন্দর চ্যানেল ড্রেজিং হয়, যাতে নাব্যতা বাড়ে, তাহলে বড় বড় জাহাজ এ বন্দরে আসতে পারবে।
সুন্দরবনের পর্যটক ব্যবসায়ী ও লঞ্চ বোডি মালিক সমিতির সভাপতি দিদারুল আলম বলেন, সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পের বিকাশে প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোংলা বন্দর ও এর আশপাশের এলাকাকে কেন্দ্র করে আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে ইকো-ট্যুরিজমের এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে। এতে স্থানীয় হোটেল, মোটেল, জলযান চালক এবং কুটির শিল্প সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
মোংলা বনিক সমিতির সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দরকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি উপস্থিতির ফলে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। খুলনা, বাগেরহাটসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে।
মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী জাহানারা এন্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী মাহবুবুর রহমান মানিক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক আগমন প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার দেশের প্রান্তিক ও সম্ভাবনাময় জনপদগুলোর উন্নয়নে কতটা আন্তরিক। তাদের প্রত্যাশা, এই সফরের মধ্যদিয়ে মোংলা বন্দর এলাকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বা অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হবে এবং বন্দরটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দূরদর্শী সফর মোংলা বন্দর ও এর অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যকারিতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং দেশের সামগ্রিক জিডিপি বৃদ্ধিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করবে।
খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারী হেলাল জানিয়েছেন, সফরের অংশ হিসেবে মোংলা নৌঘাঁটিতে বৈঠক, মোংলা বন্দরের জেটি পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘুরে দেখার কর্মসূচি রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়গুলো এ সফরে গুরুত্ব পেতে পারে।
জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ অঞ্চলের সমুদ্র এলাকা, সুন্দরবন এবং তার পাশ্ববর্তী এলাকা, মোংলা বন্দর, মোংলা ইপিজেড পরিদর্শনে আসবেন। আসার পরে এগুলো কিভাবে আরো বেশি কার্যকরী করা যায়, কিভাবে নতুন প্রজেক্ট তৈরি করা যায়, কিভাবে ওইখানে বিনিয়োগ আনা যায় সে ব্যাপারে পরবর্তীতে ঘোষণা দেওয়া হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেকটি জনপদ সফর করছেন। যেহেতু মোংলা দেশের দ্বিতীয় সামুদ্রিক বন্দর, এ বন্দরে জাহাজের সক্ষমতা এবং মুভমেন্ট কিভাবে বাড়ানো যায় তা তিনি সরাসরি পরিদর্শন করবেন। এছাড়াও চায়নারা মোংলাতে যে ইনভেস্টের ঘোষণা দিয়েছে, সেই ইনভেস্টের স্থান তিনি পরিদর্শন করবেন। চায়নাদের মোংলা ইপিজেডে একটি এক্সপোর্ট প্রসেসিং স্পেশাল জোন দেওয়া হয়েছে। সেই জন্য তারা কি কি ফ্যাক্টরি করবে, আমাদের কি কি বেনিফিট হবে সে ব্যাপারে তাদের সাথে সরাসরি আলাপ হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের উপরে চাপ কমিয়ে মোংলা বন্দরকে কিভাবে গতিশীল করা যায় সে ব্যাপারটা বেশি গুরুত্ব পাবে বলে মনে করছি। বন্দর ও ইকোনমিকজোন পরিদর্শনের পাশাপাশি তিনি সুন্দরবনও পরিদর্শন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে মোংলা বন্দর ইপিজেট এবং শিল্পাঞ্চলের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মোংলা নদীর উপর সেতু, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে এসব তার নজরে আনা হবে। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ফয়লায় খানজাহান আলী বিমান বন্দরের ভিত্তি প্রস্তরের উদ্বোধন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেই বিমান বন্দরটিও তার নজরে আনবো আমরা। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে মোংলা বন্দর, সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃতি, বাণিজ্য ও শিল্পায়নের তিন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এক সুতোয় গাঁথা এই সফরকে ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (এক্সিম ব্যাংক) মধ্যে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৮৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা) মূল্যমানের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে থেকে জনানো হয়, চুক্তির আওতায় চীন সরকার প্রকল্পটির জন্য ২ দশমিক ৪০৪ বিলিয়ন আরএমবি ঋণ দেবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ গৃহীত ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এ ঋণ ব্যবহার করা হবে। ঋণচুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্মসচিব আলিয়া মেহের এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের পক্ষে অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার ফেংজুন তিয়ান স্বাক্ষর করেন।
প্রকল্পটির আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল, কন্টেইনার ইয়ার্ড, কন্টেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি বন্দরের প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন করা হবে।
খুলনা গেজেট/এএজে
