জাপানের মোরিওকা শহরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আনন্দের অন্যতম প্রাণের উৎসব ‘সানসা ওদোরি’। উত্তর জাপানের ইওয়াতে প্রিফেকচারের রাজধানী মোরিওকা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য পরিচিত; আর সেই সংস্কৃতিকে মানুষের হৃদয়ের আরও কাছে নিয়ে আসে ‘সানসা ওদোরি’ মোরিওকা শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
‘সানসা’ শব্দটি একটি ঐতিহ্যবাহী লোকগানের সঙ্গে সম্পর্কিত; আর ‘ওদোরি’ মানে নৃত্য। প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে অনুষ্ঠিত এই উৎসব মোরিওকার রাস্তাগুলোকে ঢোলের শব্দ, নৃত্য, গান এবং মানুষের আনন্দে যেন নতুন প্রাণ দেয়। মনে হয় কিছুদিনের জন্য প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি বাড়ি এবং প্রতিটি মানুষের হৃদয় একই ছন্দে স্পন্দিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি নৃত্য উৎসব নয়; বরং মোরিওকা ও ইওয়াতে অঞ্চলের ইতিহাস, লোকগাথা, ঐতিহ্য এবং মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা ও আনন্দের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
এবার ১ থেকে ৪ আগস্ট মোরিওকা শহরের চুয়ো ওদোরি সড়কে এই অনুষ্ঠানের প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবকে ঘিরে রাস্তার দুই পাশ সুন্দর করে সাজানো হয়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নৃত্যের প্যারেড। অসংখ্য নৃত্যশিল্পী সারিবদ্ধভাবে রাস্তায় নাচতে নাচতে এগিয়ে যান। তাঁদের পরনে থাকে জাপানের ঐতিহ্যবাহী পোশাক; আর মাথায় থাকে সুন্দর অলংকার। তাঁদের সাজসজ্জা, হাসি ও নৃত্যের ছন্দ মিলিয়ে পুরো পরিবেশে যেন উৎসবের এক অপূর্ব আবেশ তৈরি হয়।
এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো তাইকো ঢোলের শব্দ। শত শত ঢোল একসঙ্গে বাজতে শুরু করলে মনে হয়, পুরো শহর যেন সেই ছন্দে জেগে উঠেছে। ঢোলের প্রতিটি শব্দ যেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসা কোনো প্রাচীন স্মৃতির কথা বলে। তার সঙ্গে শত শত বাঁশির সুরেলা আওয়াজ এবং নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশিত নৃত্য রাস্তার দুই পাশে জড়ো হওয়া মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে। দর্শকদের চোখে বিস্ময়, মুখে হাসি আর চারপাশে কেবল আনন্দের ঢেউ।

শত শত নৃত্যশিল্পী দলবদ্ধভাবে একই ছন্দে, একই ধরনের পদক্ষেপ, হাতের নাড়াচাড়া ও শরীরের অঙ্গভঙ্গি এত সুন্দরভাবে সমন্বয় করে পরিবেশন করেন যে তা সত্যিই অবিশ্বাস্য লাগে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের তাল, একটি দলের সঙ্গে অন্য দলের ছন্দ—সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, শত শত মানুষ নয়, যেন একটি বিশাল হৃদয় একই সঙ্গে স্পন্দিত হচ্ছে। সেই দৃশ্য শুধু চোখে দেখা যায় না, অনুভব করা যায়।
এই উৎসবে শুধু পেশাদার নৃত্যশিল্পীরাই অংশগ্রহণ করেন না। স্থানীয় বিভিন্ন কোম্পানি, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, সংগঠন, সম্প্রদায় এবং সাধারণ মানুষও বিভিন্ন দলের নামে এতে অংশগ্রহণ করেন। ফলে ‘সানসা ওদোরি’ ধীরে ধীরে একটি নৃত্য অনুষ্ঠানকে ছাড়িয়ে সবার মিলনমেলায় পরিণত হয়। ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মানুষ—সব বয়সের মানুষ এখানে আনন্দের অংশীদার হন। প্রজন্মের ব্যবধান যেন এই কয়েক দিনের উৎসবে কোথাও হারিয়ে যায়।
অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই নৃত্যের অনুশীলন করেন, যাতে উৎসবের সময় তাঁরা নিজেদের দলের সঙ্গে সুন্দরভাবে পরিবেশন করতে পারেন। তাঁদের এই দীর্ঘ প্রস্তুতির মধ্যে শুধু নাচ শেখার চেষ্টা থাকে না; থাকে নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা, ঐতিহ্যকে ধরে রাখার দায়বদ্ধতা এবং একসঙ্গে কিছু সুন্দর মুহূর্ত সৃষ্টি করার আকাঙ্ক্ষা।
‘সানসা ওদোরি’র সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো এর মাধ্যমে মোরিওকার মানুষ তাঁদের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন। এই উৎসব নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। শিশুরা বড়দের কাছ থেকে শেখে, তরুণেরা নতুন উৎসাহ নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করে এবং এভাবেই বহু পুরোনো একটি সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলায়, মানুষের জীবনযাত্রা বদলায়, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে আরও আধুনিক করে তোলে; কিন্তু কিছু ঐতিহ্য মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে শিকড় গেড়ে থাকে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না; বরং নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আরও নতুন প্রাণ পায়। ‘সানসা ওদোরি’ ঠিক তেমনই একটি ঐতিহ্য।
তাই ‘সানসা ওদোরি’ শুধু অতীতের একটি উৎসব নয়; এটি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হওয়া এক অদৃশ্য সেতু। ঢোলের প্রতিটি শব্দে যেন অতীতের গল্প শোনা যায়, নৃত্যের প্রতিটি পদক্ষেপে বর্তমানের আনন্দ ধরা পড়ে; আর শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসে দেখা যায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

মোরিওকার গ্রীষ্মের সেই সন্ধ্যায় যখন শত শত মানুষ একই ছন্দে নাচে, ঢোল ও বাঁশির সুরে যখন পুরো শহর মুখর হয়ে ওঠে, তখন মনে হয়, এ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের, অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে ভবিষ্যতের এক গভীর হৃদয়ের বন্ধন। ‘সানসা ওদোরি’ তাই মোরিওকার একটি উৎসবের নাম নয়; এটি মোরিওকার মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক জীবন্ত সংস্কৃতির নাম।
লেখক পরিচিতি: অধ্যাপক সঞ্জয় সরকার, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রাণী গবেষণা সেন্টার, ইওয়াতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানে কর্মরত।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com
