দেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই বাড়লেও নতুন মূলধন বিনিয়োগের প্রবাহে কাঙ্ক্ষিত গতি দেখা যাচ্ছে না। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআইয়ের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির সিংহভাগই এসেছে পূর্বে নিবন্ধিত বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ থেকে। অন্যদিকে নতুন মূলধন বা ইকুইটি বিনিয়োগের হার হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহে বড় ধরনের ধস দেখা গেছে।
বিনিয়োগের প্রকারভেদ ও মূল চিত্র
- মোট নিট এফডিআই: ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার
- পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা: ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলার (মোট নিট এফডিআইয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ)
- নিট ইকুইটি মূলধন (নতুন বিনিয়োগ): ৭ কোটি ৭ ৪ লাখ ২০ হাজার ডলার (আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৭৭ শতাংশ কম)
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করেছে যে দেশে প্রধানত তিনটি খাতে সরাসরি বিদেশি মূলধন আসে। এগুলো হলো নিট পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়, নতুন ইকুইটি মূলধন এবং নিট আন্তঃকোম্পানি ঋণ। পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে আন্তর্জাতিক মূলধনের মূল অংশ এসেছে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের পুনর্নিয়োগ করা আয় থেকে। ফলে সামগ্রিক এফডিআই ইতিবাচক থাকলেও নতুন বিদেশি কোম্পানি বা মূলধন আসার চিত্র তুলনামূলক দুর্বল।
পরিসংখ্যান অনুসারে, আলোচ্য প্রান্তিকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে। যদিও এ সময়ে মোট ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের ঋণপ্রবাহ ছিল, তবে পূর্বের গৃহীত ঋণ পরিশোধ করার কারণে নিট প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে নেমে এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী মূল্যের প্রভাবেই বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন উইং) নাহিয়ান রহমান রচি পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় বলেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এফডিআই বৃদ্ধি পাওয়া ইতিবাচক লক্ষণ। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগ বৃদ্ধি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতি তাদের আস্থার প্রমাণ দেয়, যা উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো ও কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা করবে। এ ধরনের বিনিয়োগ ব্যবসা সম্প্রসারণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ পাইপলাইন বাস্তবায়নে কাজ করছে। নীতিগত ও কাঠামোগত বাধা দূর করে এসব প্রকল্প বাস্তবে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক বিনিয়োগ প্রস্তাবকেও আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। নাহিয়ান রহমান রচি জানান, সংস্থাটির ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিতে কাজ চলছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিট এফডিআই এসেছে ৪ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ কম। যদিও এর আগের প্রান্তিকের মাত্র ০.৪২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় এটি কিছুটা বেশি, তবুও বছরওয়ারি হিসাবে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ সময়ে নিট ইকুইটি বিনিয়োগ হয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কম।
অন্যদিকে, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেডের বাইরের খাতগুলোতে নিট এফডিআই ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৮০ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ঘাটতি কিছুটা হলেও অন্য খাতের প্রবৃদ্ধি দিয়ে পূরণ হয়েছে।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে পুরোপুরি প্রস্তুত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে স্থবির থাকা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের কাজ পুনরায় গতি পেয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে এই প্রকল্প সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাকে ঘিরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এই অর্জনের বিষয়টি এবং ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা বিস্তারিত তুলে ধরেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি আরও জানান, ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রকাশিত ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ পর্যন্ত অর্জন ও বাকি কাজের বিষয়ে তুলে ধরা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- বিপরীতে, নতুন মূলধন বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহেও বড় ধস নেমেছে।
The post নিট এফডিআই বাড়লেও নতুন মূলধন বিনিয়োগে ধীরগতি appeared first on Daily Sangbad Chorcha.
