সিংহারূঢ়া, দশভুজা, ত্রিনয়নী দেবী চন্দ্রঘণ্টা। তাঁর মস্তকে অর্ধচন্দ্র, আর তৃতীয় নয়নে প্রজ্বলিত অশুভ বিনাশের অগ্নি। নবরাত্রির তৃতীয় দিনে দেবীর এই রূপ কেবল শক্তির আরাধনা নয়, আত্মবিশ্বাস, সাহস ও অন্তর্জাগরণেরও বার্তা দেয়।
নবরাত্রির প্রথম দিনে শৈলপুত্রী, দ্বিতীয় দিনে ব্রহ্মচারিণী। তৃতীয় দিনে দেবী আবির্ভূতা হন চন্দ্রঘণ্টা রূপে। সাধনার শেষে আসে সিদ্ধি। কঠোর তপস্যায় সিদ্ধিলাভের পর পার্বতী এবার সংসারধর্মে ব্রতী। প্রকৃতি ও দেবকুলের মনে আশার সঞ্চার হয়। কারণ, শিব-পার্বতীর মিলনেই যে সম্ভব তারকাসুরের বিনাশ।
কিন্তু কে এই তারকাসুর? কেনই বা দেবীকে ধারণ করতে হয়েছিল এমন ভয়ংকর রূপ? পুরাণকথা অনুসারে, বজ্রাঙ্গ ও বজ্রাঙ্গীর পুত্র তারকাসুর ছিলেন প্রবল পরাক্রমশালী। শক্তি ও বীরত্বের শিখরে পৌঁছেও তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল আরও বড়। স্বর্গজয়ের বাসনায় শুরু করলেন কঠোর তপস্যা। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা বর দিতে উপস্থিত হলে কৌশলী তারকাসুর প্রার্থনা করলেন, তিনি যেন সকল প্রাণী ও মহাস্ত্রের অবধ্য হন।
ব্রহ্মা সেই বর দিলেন একটি শর্তে—শিবের সাত বছরের পুত্রের হাতেই কেবল তাঁর মৃত্যু সম্ভব। তারকাসুরের মনে তখন নিশ্চিন্তির ছায়া। মহাদেব তো যোগনিদ্রায় মগ্ন, সংসারবিমুখ। তাঁর সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা কোথায়! অতএব, কার্যত অমরত্বই লাভ করেছেন তিনি।
কিন্তু বিধির বিধান অন্য। পার্বতীর কঠোর সাধনা, কামদেব এবং দেবতাদের উদ্যোগে মহাদেবের ধ্যান ভাঙল। শিব-পার্বতীর বিবাহের আয়োজন করা হল। তারকাসুরের আশঙ্কা বাড়ল। ক্রুদ্ধ তারকাসুর বিবাহমণ্ডপে পাঠালেন তাঁর ভয়ংকর সেনাবাহিনী।
বিবাহমণ্ডপে দেবীর আবির্ভাব অন্যদিকে, বিবাহমণ্ডপেও তখন এক বিচিত্র পরিস্থিতি। শ্মশানচারী মহাদেব এসেছেন তাঁর চিরাচরিত বেশে—সর্বাঙ্গে ভস্ম, পরনে ব্যাঘ্রচর্ম, চারপাশে ভূতপ্রেত ও বিচিত্র অনুচর। এমন জামাতা দেখে পার্বতীর মাতা মেনকা মূর্ছিত হলেন। তখনই দেবী প্রকাশিত হলেন তাঁর মহাশক্তিময় স্বরূপে; চন্দ্রঘণ্টা।
সিংহারূঢ়া দশভুজা দেবী। হাতে নানা অস্ত্র, মুখে ত্রিভুবনজয়ী দীপ্তি। মস্তকে ঘণ্টার মতো দোদুল্যমান অর্ধচন্দ্র, আর ললাটে সদাজাগ্রত তৃতীয় নয়ন। দেবীর এই রূপে একদিকে মাতৃস্নেহের আশ্বাস, অন্যদিকে অশুভ বিনাশের দুর্জয় সংকল্প।
এমন সময় এসে উপস্থিত হল তারকাসুরের বাহিনী। দেবীর তৃতীয় নয়নের ভয়ংকর রোষাগ্নিতে মুহূর্তে ছারখার হয়ে গেল তারা। শান্ত হল বিবাহমণ্ডপ। মহাদেব ধারণ করলেন রাজবেশ, পার্বতী ফিরলেন রাজকন্যার সাজে। সম্পন্ন হল শুভবিবাহ।
দেবী চন্দ্রঘণ্টা সিংহবাহিনী, দশভুজা ও ত্রিনয়নী। তাঁর দশ হাতে থাকে নানা অস্ত্র, যা শক্তি, সাহস ও অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। মস্তকের অর্ধচন্দ্র ঘণ্টার আকৃতির মতো হওয়ায় তাঁর নাম চন্দ্রঘণ্টা। তাঁর রূপে সংগ্রাম, করুণা ও মহিমা মিলেমিশে একাকার।
দেবী চন্দ্রঘণ্টার আরাধনা মনে করিয়ে দেয়, আত্মবোধ সদা জাগ্রত থাকা জরুরি। জীবনের প্রতিটি বিপদকে বাইরে থেকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়; অনেক সময় নিজের ভিতরের সংশয়, দ্বিধা ও ভয়কে জয় করাই সবচেয়ে বড় সাধনা। আত্মোপলব্ধি, আত্মবিশ্বাস ও সাহস মানুষকে সেই পথ দেখায়।
মানসিক দ্বন্দ্ব কিংবা অনিশ্চয়তা চিরস্থায়ী নয়। যে মানুষ নিজের ভিতরের শক্তিকে চিনতে শেখে, সে-ই প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস পায়। দেবী চন্দ্রঘণ্টা তাই কেবল অসুরবিনাশিনী নন, তিনি অন্তরের অন্ধকার দূর করে জাগ্রত চেতনারও প্রতীক।
মা মানেই নিরাপদ আশ্রয়। তাঁর শাসন আছে, বারণ আছে, বিধিনিষেধও আছে; তবু মাতৃস্নেহের আড়ালেই মানুষ খুঁজে পায় এক অদ্ভুত নিশ্চয়তা ও প্রশান্তি। নবরাত্রির নয় দিনে দেবীর নয়টি রূপ যেন জীবনের নয়টি পাঠ—স্থিতি, সাধনা, সাহস, আত্মবিশ্বাস, মমত্ব, সংযম, সংকল্প ও আত্মজাগরণের পথনির্দেশ।
দেবী চন্দ্রঘণ্টা সেই পথের তৃতীয় আলোকবর্তিকা। তাঁর আরাধনায় তাই প্রার্থনা; বিপদের মুখে যেন চেতনা নিদ্রিত না হয়, ভয়ের কাছে যেন সাহস পরাজিত না হয়, আর অন্তরের শক্তিকে চিনে যেন মানুষ নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিতে পারে।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।
