মোহাম্মদ উজ্জ্বল, মহম্মদপুর (মাগুরা)
একসময় সেলুনে চুল কাটতে গিয়ে অপমানিত হয়েছিলেন মোহাম্মদ রাজু আহমেদ। ‘তুমি নাপিত, তুমি অশিক্ষিত, তুমি আমার সঙ্গে কী কথা বলবা’—এক ব্যক্তির এমন কটূক্তি গভীরভাবে আঘাত করেছিল তাঁকে। সেই অপমানকে শক্তিতে পরিণত করে নিজের সেলুনের নাম রাখেন ‘অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন’। তবে সেখানেই থেমে থাকেননি তিনি। চুল কাটার পাশাপাশি গ্রাহকদের বই পড়ার সুযোগ করে দিতে গড়ে তুলেছেন ছোট্ট একটি পাঠাগার। শুরুতে মাত্র তিনটি বই থাকলেও এখন তাঁর সংগ্রহে রয়েছে শতাধিক বই। সেলুনে চুল কাটার অপেক্ষায় থাকা মানুষ সেখানে বসেই পড়তে পারছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাসসহ নানা ধরনের বই।

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের শিকদারের মোড়ে অবস্থিত রাজুর এই সেলুন বাইরে থেকে দেখতে আর দশটি সাধারণ দোকানের মতোই। তবে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে বইয়ের সংগ্রহ, দেয়ালজুড়ে কবিতার পঙ্ক্তি ও অনুপ্রেরণামূলক নানা লেখা। কাঁচি-চিরুনির পাশাপাশি বইয়ের এমন উপস্থিতি সেলুনটিকে দিয়েছে ভিন্ন পরিচিতি। এটি যেন চুল কাটার দোকানের আড়ালে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটি পাঠাগার।
অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারানো রাজুর পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। দারিদ্র্যের কারণে নবম শ্রেণির পর বন্ধ হয়ে যায় তাঁর শিক্ষাজীবন। তবে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ কখনো হারাননি তিনি। প্রায় ১০ বছর ধরে সেলুনের কাজের সঙ্গে যুক্ত রাজু প্রথমে স্থানীয় কলমধারী বাজারে চুল কাটার কাজ শেখেন। পরে ঢাকার বিভিন্ন সেলুনে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এরপর নিজ এলাকায় ফিরে শিকদারের মোড়ে গড়ে তোলেন নিজের সেলুন।
নিজের দোকানে প্রথমে মাত্র তিনটি বই দিয়ে পাঠাগারের যাত্রা শুরু করেন রাজু। ধীরে ধীরে চুল কাটতে আসা গ্রাহকেরা অপেক্ষার সময় বই পড়তে শুরু করেন। তাঁদের কেউ কেউ উৎসাহিত হয়ে বাড়ি থেকেও বই এনে উপহার দেন। এভাবেই ইসলামি বই, উপন্যাস, গল্পসহ বিভিন্ন ধরনের বই নিয়ে গড়ে ওঠে তাঁর শতাধিক বইয়ের সংগ্রহ।
রাজুর স্বপ্ন, একদিন তাঁর সেলুনটি আরও বড় ও পূর্ণাঙ্গ পাঠাগারে পরিণত হবে। মানুষ সেখানে চুল কাটানোর পাশাপাশি অবসর সময়ে বই পড়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন।
মানবিক উদ্যোগেও এগিয়ে রাজু
নিজে এতিম হওয়ায় এতিম শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে চুল কাটার ব্যবস্থা রেখেছেন রাজু। মসজিদের ইমাম ও খতিবদের কাছ থেকে নেওয়া হয় অর্ধেক বিল। এ ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তি এবং শরিয়তসম্মতভাবে চুল-দাড়ি কাটার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা।
রাজুর ভাষ্য, কোনো ব্যক্তিগত প্রাপ্তির আশায় নয়, সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই তিনি এসব কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর এই উদ্যোগে স্থানীয়দের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া তৈরি হয়েছে।
অপমান থেকেই নতুন পথচলা
সেলুনের নাম ‘অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন’ রাখার পেছনের ঘটনা তুলে ধরে রাজু আহমেদ বলেন, ‘আসলে মানুষ কখনোই অশিক্ষিত হতে চায় না। বেঁচে থাকার তাগিদে অল্প বয়সেই উপার্জনের জন্য কাজে নেমে পড়তে হয়। একজন শিক্ষিত ব্যক্তি অনেক মানুষের সামনে আমাকে বলেছিলেন, “তুমি নাপিত, তুমি অশিক্ষিত, তুমি আমার সঙ্গে কী কথা বলবা?” কথাটি আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। সেই কষ্ট থেকেই আমার সেলুনের নাম দিয়েছি “অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন”।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমিও একজন এতিম। তাই এতিম শিশুদের বিনা মূল্যে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি চাই, কাজের পাশাপাশি আমার দোকানে একটি সুন্দর ও বড় পাঠাগার গড়ে উঠুক। মানুষের যে সময়টুকু সেলুনে অপেক্ষা করে কাটে, সেটি যেন জ্ঞান অর্জনে কাজে লাগে।’
বই পড়ার পরিবেশে খুশি গ্রাহকেরা
সেলুনটির নিয়মিত গ্রাহক মো. রিয়াজ আহম্মেদ বলেন, ‘রাজু ভাইয়ের এখানে দীর্ঘদিন ধরে চুল কাটাই। অনেক সময় সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তখন বাজারে ঘোরাঘুরি বা ফোন না দেখে সেলুনে বসে বই পড়ি। এখানে বই পড়ার পরিবেশটা ভালো লাগে। এ কারণেই রাজু ভাইয়ের সেলুনে আসি।’
রাজুর উদ্যোগের প্রশংসা করে বালিদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান মিনা বলেন, ‘রাজু এলাকার যুবকদের বই পড়তে উৎসাহিত করছে। একসময় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারার যে আক্ষেপ তার ছিল, তা আজ সে অনন্য উপায়ে পূরণ করছে।’ এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে বালিদিয়াবাসীর প্রতি রাজুকে সহযোগিতা করার আহ্বানও জানান তিনি।
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে মানুষের অবসর কাটানোর ধরনে যখন পরিবর্তন এসেছে, তখন মহম্মদপুরের এই ছোট্ট সেলুনে বই পড়ার এমন আয়োজন স্থানীয়ভাবে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত জীবনের অপমানকে পেছনে ফেলে রাজু নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বই পড়ার পরিবেশ তৈরি করেছেন। তাঁর স্বপ্ন, সেলুনের পরিসর ছাড়িয়ে একদিন এই উদ্যোগ আরও বড় পাঠাগারে রূপ নেবে।

