বহুপ্রতীক্ষিত পুজোর দিনগুলি বাহিত হয়ে গেল। আবার এক বছরের অপেক্ষা। পুজোর শেষে প্যান্ডেল ভেঙে যায়। থেকে যায় তার ছবি, এবং দর্শকের স্মৃতি। সেই অবকাশে ফিরে দেখা দুর্গাপুজোর শিল্পভাষাকে। তার সঙ্গে একাত্ম হতে পারা বা না-পারার সম্ভাবনাকে। লিখছেন অমৃতা দাশগুপ্ত।
উত্তর কলকাতার চোরবাগানের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা (১৭ অক্টোবর, পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু) দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল নিয়ে আমাদের প্রচলিত নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনার সীমা নতুন করে বিবেচনা করতে বাধ্য করে। প্রাথমিক সংবাদ-প্রতিবেদনে প্রবল বৃষ্টি, অতিরিক্ত জনসমাগম, সংকীর্ণ প্রবেশ ও নির্গমনপথ এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ত্রুটির কথা উঠে এসেছে। দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ তদন্তসাপেক্ষ। তবে ঘটনাটি এমন একটি প্রশ্ন সামনে আনে, যা দুর্গাপুজোর শিল্পচর্চার আলোচনায় কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পাওয়া উচিত: যে প্যান্ডেলে বিপুল জনসমাগম ঘটতে পারে, তার নান্দনিক পরিকল্পনা কীভাবে মানুষের নিরাপত্তা এবং শিল্পের ‘অর্থ’ উপলব্ধি করার সুযোগ– উভয়কেই নিশ্চিত করতে পারবে?
প্যান্ডেলের অন্ধকারাচ্ছন্ন সংকীর্ণ পথ, বা প্রতিমাকে ধাপে ধাপে উন্মোচিত করার বিন্যাস কোনও শিল্পীর নান্দনিক অভিপ্রায়ের অংশ হতে পারে। কিন্তু এমন পরিকল্পনার মূল্যায়নে জনসমাগমের বাস্তবতাকে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। আবার, চোরবাগানের দুর্ঘটনাকে কোনও নির্দিষ্ট শিল্পভাবনার প্রত্যক্ষ পরিণতি বলে চিহ্নিত করারও ভিত্তি নেই। তবে ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে, স্থাপত্যের নকশা এবং দর্শকের চলাচল একই পরিসরের অংশ। মানুষের শরীরের মধ্য দিয়েই শিল্পের অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। সেই অভিজ্ঞতার শর্ত রূপে নিরাপদ প্রবেশ, পর্যাপ্ত দৃশ্যমানতা, এবং ‘জরুরি অবস্থা’-এ দ্রুত বেরিয়ে আসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা তাই শিল্প-পরিকল্পনারই দায়িত্ব।
ঘটনাটি এমন একটি প্রশ্ন সামনে আনে, যা দুর্গাপুজোর শিল্পচর্চার আলোচনায় কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পাওয়া উচিত: যে প্যান্ডেলে বিপুল জনসমাগম ঘটতে পারে, তার নান্দনিক পরিকল্পনা কীভাবে মানুষের নিরাপত্তা এবং শিল্পের ‘অর্থ’ উপলব্ধি করার সুযোগ– উভয়কেই নিশ্চিত করতে পারবে?
‘মণ্ডপ’ থেকে ‘প্যান্ডেল’
ছোটবেলায় পুজোর সময় মা বলতেন, ‘চলো, মণ্ডপ দেখে আসি’। এখন সেই কথাটাই বদলে গিয়ে দঁাড়িয়েছে, ‘চলো, প্যান্ডেল দেখে আসি’। দৈনন্দিন কথাবার্তার এই পরিবর্তনের মধ্যে দুর্গাপুজোকে দেখার অভ্যাসের একটি সাংস্কৃতিক ইতিহাস ধরা পড়ে। ‘মণ্ডপ’ শব্দটি মূলত দেবদর্শন ও পূজার পরিসরের কথা মনে করায়। ‘প্যান্ডেল’ শব্দটির ব্যবহার ক্রমে সেই পরিসরের নির্মাণকেও স্বতন্ত্র আকর্ষণ দিয়েছে। দেবীপ্রতিমাকে ঘিরে নির্মিত স্থাপত্য স্বয়ং দর্শনীয় হয়ে উঠেছে এবং প্রতিমার সঙ্গে তার সম্পর্কও শিল্পের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
বাংলার ‘সর্বজনীন দুর্গাপুজো’-র ইতিহাসে এই রূপান্তরের সামাজিক ভিত্তি রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ‘বারোয়ারি’ ও ‘সর্বজনীন’ পুজোর বিস্তার উৎসবকে পারিবারিক ও জমিদারবাড়ির পরিসর থেকে বৃহত্তর জনসমাজের কাছে নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে শিল্পী ও কারিগরদের ভূমিকা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মণ্ডপ নির্মাণেও নানা পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয়। বিশেষত বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিষয়ভিত্তিক পুজোর প্রসার মণ্ডপের স্থাপত্যকে স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। লোকশিল্প ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি পুরাণ এবং সমকালীন জীবনও প্যান্ডেল নির্মাণের বিষয় হয়ে ওঠে। পুরস্কার, সংবাদমাধ্যমের প্রচার এবং পুজো-পর্যটনের প্রসার এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে।
‘মণ্ডপ’ শব্দটি মূলত দেবদর্শন ও পূজার পরিসরের কথা মনে করায়। ‘প্যান্ডেল’ শব্দটির ব্যবহার ক্রমে সেই পরিসরের নির্মাণকেও স্বতন্ত্র আকর্ষণ দিয়েছে।
‘থিম পুজো’-র সূচনা কোনও একক মণ্ডপ বা নির্দিষ্ট বছরের সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা কঠিন। একাধিক শিল্পী, কারিগর ও পুজো কমিটির পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এই শিল্পরীতি বিকশিত হয়েছে। ক্রমে প্যান্ডেলের মূল্যায়নে প্রতিমার পাশাপাশি স্থাপত্যের অভিনবত্ব এবং বিষয়ের উপস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে প্যান্ডেল কেবল পূজার পরিসর হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব ও বক্তব্যসম্পন্ন একটি শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে।
প্যান্ডেলের শিল্পভাষা
একটি ‘থিম পুজো’-র ‘অর্থ’ তার ঘোষিত বিষয়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ নির্ধারিত হয় না। সেই বিষয় কীভাবে স্থাপত্য ও উপকরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে, তার উপরও সেই ‘অর্থ’ নির্ভর করে। প্রবেশপথ দর্শকের গতিপথ নির্ধারণ করে, আলোর বিন্যাস দৃশ্যের উন্মোচন নিয়ন্ত্রণ করে, উপকরণের নির্বাচন পরিচিত বস্তুকে নতুন তাৎপর্য দিতে পারে। এসব উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই প্যান্ডেলের শিল্পভাষা নির্মিত হয়।
শিল্পেতিহাসবিদ ক্লেয়ার বিশপ তঁার ‘Installation Art: A Critical History’ (২০০৫) বইয়ে দেখিয়েছেন, ইনস্টলেশন শিল্পে দর্শকের শারীরিক উপস্থিতি ও স্থানিক অভিজ্ঞতা শিল্পকর্মের অর্থ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রায়ান ও’ডোহার্টি তঁার ‘Inside the White Cube: The Ideology of the Gallery Space’ (১৯৭৬) বইয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, প্রদর্শনীর পরিসর শিল্পবস্তুকে দেখার পদ্ধতিকে কীভাবে প্রভাবিত করে। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল বোঝার জন্য কার্যকর। প্যান্ডেলের স্থাপত্য তখন নিছক সাজসজ্জা হিসাবে বিবেচিত হয় না; দর্শকের অভিজ্ঞতা সংগঠিত করার একটি পদ্ধতি হিসাবেও তা পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালে ‘টালা প্রত্যয়’-এর ‘বিহীন’ (‘The Void’) এই আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সুশান্ত শিবানী পালের পরিকল্পনায় নির্মিত প্রকল্পটিতে শূন্যতা ও নিরাকার অস্তিত্বের ধারণাকে স্থানিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ধরনের শিল্পকর্মের ‘অর্থ’ কোনও একটি প্রতীক শনাক্ত করার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। দর্শককে নির্মিত পরিসরের সামগ্রিক বিন্যাসের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশ কীভাবে একটি ধারণাকে প্রকাশ করছে, সেই সম্পর্ক উপলব্ধি করলেই শিল্পকর্মের অন্তর্নিহিত বক্তব্য স্পষ্টতর হয়ে ওঠে।
একটি ‘থিম পুজো’-র ‘অর্থ’ তার ঘোষিত বিষয়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ নির্ধারিত হয় না। সেই বিষয় কীভাবে স্থাপত্য ও উপকরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে, তার উপরও সেই ‘অর্থ’ নির্ভর করে।
মনে পড়ে, সেই প্যান্ডেলে এমন একটি জায়গা হঠাৎই সামনে এসে পড়েছিল, যেখানে সরু, ঢালু পথ বেয়ে ক্রমশ উঁচুতে উঠে যাওয়া যায়। মনে হচ্ছিল, সেই পথের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছতে পারলেই বুঝি আকাশের অনন্ত দিগন্তের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়া যাবে। অথচ সেই উচ্চতায় পৌঁছনোর পর আবার ধীরে ধীরে নেমে আসতে হয়। তারপর প্রবেশ করতে হয় আরও একটি অন্ধকার গলিতে, যার এক প্রান্তে অভয়-রূপী মা উজ্জ্বল মুখে শূন্যের মধ্যে ভেসে রয়েছেন।
এ এক শরীরী অভিজ্ঞতা। এমন একটি অভিজ্ঞতা অর্জন আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল হয়তো এই কারণে যে, ভিড় এড়িয়ে প্রায় ফঁাকা প্যান্ডেলের মধ্যে দিয়ে এই যাত্রাটুকু আমি নিজের মতো করে উপভোগ করতে পেরেছিলাম। আবার হয়তো তার কারণ, শিল্পের অর্থ আমার কাছে অনেক বিস্তৃত। শিল্পকে সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করার বিষয় বলে মনে করি, এমন এক অভিজ্ঞতা, যা তড়িৎপ্রবাহের মতো শরীরের ভিতর দিয়ে বয়ে যায়। যা কেবল চোখে দেখা বা বুদ্ধি দিয়ে বোঝার বিষয় নয়, বরং এমন এক অনুভব, যা আমাদের সমগ্র অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেয়, ভাবায়, কাঁপিয়ে তোলে।
এখানেই ‘প্যান্ডেল’-কে পড়ার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনও থিমের নাম জানা এবং তার শিল্পভাষা বোঝা এক অভিজ্ঞতা নয়। শিল্পের বক্তব্য উপলব্ধি করতে দর্শককে বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। অথচ ‘প্যান্ডেল হপিং’-এর প্রচলিত অভ্যাসে এই পাঠের জন্য প্রয়োজনীয় সময় প্রায়ই সীমিত থাকে।
প্রদর্শনী, প্যান্ডেল, দেখার সময়
প্রদর্শশালায় দর্শক সাধারণত নিজের গতিতে শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়াতে পারে। সে ব্যাখ্যাপত্র পড়তে পারে এবং প্রয়োজনে আগের কোনও অংশে ফিরে যেতে পারে। এই সুযোগ শিল্পকর্মের সঙ্গে দীর্ঘতর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে দর্শকের অভিজ্ঞতা জনসমাগমের গতির দ্বারা অনেকাংশে নির্ধারিত হয়। দীর্ঘ সারি এবং পরবর্তী প্যান্ডেলে পৌঁছনোর তাড়া তার দেখার সময়কে সীমিত করে। ফলে শিল্পকর্মের প্রতিটি উপাদান মনোযোগ দিয়ে বোঝার সুযোগ সবার সমান থাকে না।
২০২৫ সালে ‘আলিপুর সর্বজনীন’-এর ‘চা-পান-উতোর’ থিমটি এই সমস্যাটি বোঝার একটি কার্যকর উদাহরণ। চায়ের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্যান্ডেলটি একটি পরিচিত পানীয়ের সঙ্গে ঔপনিবেশিক বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্ককে সামনে এনেছিল। এই বিষয় নির্বাচনের মধ্যে ইতিহাসকে জনপরিসরে উপস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু চায়ের বিভিন্ন উপস্থাপনার মধ্যে যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক নির্মিত হয়, তা বুঝতে দর্শককে একাধিক দৃশ্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে হয়। ভিড়ের মধ্যে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সময় সেই সংযোগের সব স্তর উপলব্ধি করা কঠিন হতে পারে।
একই বছরে ‘ত্রিধারা সম্মিলনী’-র ‘চলো ফিরি’ প্রকল্পে শিল্পী শিলো শিব সুলেমান ও গৌরাঙ্গ কুইলা এবং কিউরেটর ময়না মুখোপাধ্যায় আদিশক্তি ও উৎসের ধারণাকে কেন্দ্র করে একটি স্থানিক অভিজ্ঞতা নির্মাণ করেছিলেন। এই ধরনের প্রকল্পে শিল্পীর ভাবনা তার বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়। দর্শক যদি কেবল পৃথক দৃশ্যগুলিকে দেখে, তবে সামগ্রিক আখ্যানের কিছু অংশ তার কাছে অধরা থেকে যেতে পারে।
এখানে ‘প্রদর্শনী’ ও ‘প্যান্ডেল’-এর অভিজ্ঞতার পার্থক্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রদর্শনীতে একটি শিল্পকর্মের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। প্যান্ডেলে সেই সুযোগ জনস্রোতের দ্বারা সীমিত হয়। শিল্পের ধারণাগত জটিলতা এবং দর্শকের হাতে থাকা সময়ের মধ্যে এই অসামঞ্জস্য প্যান্ডেলের শিল্পভাষা বোঝার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক সমস্যা তৈরি করে।
‘থিম পুজো’ শিল্পকে বৃহত্তর জনসমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু শিল্পের ‘অর্থ’ উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও ব্যাখ্যার সুযোগ কি সেই অনুপাতে তৈরি হয়েছে? একটি থিমের নাম দর্শককে প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত বক্তব্য বুঝতে হলে নির্মাণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা প্রয়োজন। সেই সম্পর্ক বোঝার সুযোগ সীমিত থাকলে শিল্পের দৃশ্যগত অভিঘাত অক্ষুণ্ণ থেকেও তার ধারণাগত বক্তব্য অসম্পূর্ণভাবে পৌঁছতে পারে।
শিল্পের গণপ্রাপ্যতা, দর্শকের অধিকার
দুর্গাপুজোর শিল্পচর্চার বিশেষ গুরুত্ব এই যে, এটি শিল্পকে প্রচলিত প্রদর্শশালার বাইরে নিয়ে আসে। ‘প্যান্ডেল’ দেখতে যাওয়ার জন্য দর্শকের শিল্পশিক্ষা কিংবা ‘প্রদর্শনী’ দেখার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি নয়। এই উন্মুক্ততা শিল্পের সামাজিক পরিসরকে বিস্তৃত করে। তবে সকলের সামনে একটি শিল্পকর্ম উপস্থিত থাকলেই তার অর্থ সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছয় না।
যে-দর্শক সময় নিয়ে প্যান্ডেলের বিভিন্ন অংশ দেখতে পারে, ব্যাখ্যা পড়তে পারে এবং শিল্পের ভাষার সঙ্গে পরিচিত, তার পক্ষে একটি জটিল থিমের অন্তর্নিহিত সম্পর্কগুলি বোঝা সহজ হতে পারে। অন্যদিকে, যাকে ভিড়ের সঙ্গে দ্রুত এগিয়ে যেতে হয়, তার কাছে একই প্যান্ডেল প্রধানত দৃশ্যগত অভিজ্ঞতা রূপেই থেকে যেতে পারে। এই পার্থক্য দর্শকের আগ্রহ বা বোধশক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। শিল্পের অর্থ বোঝার সুযোগও নির্ভর করে সময় এবং দেখার স্বাধীনতার উপর।
শিল্পের ধারণাগত গভীরতা বজায় রেখেই দর্শকের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা সম্ভব। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাপত্র এবং উপকরণের পাশে প্রাসঙ্গিক বিবরণ দর্শককে থিমের বিভিন্ন স্তর বুঝতে সাহায্য করতে পারে। ‘কিউআর কোড’-এর মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলে যারা আরও জানতে চায়, তারা নিজের সময়ে সেই ব্যাখ্যা পড়তে পারবে। একই সঙ্গে ভিড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে পড়ার উপযোগী স্থান তৈরি করলে শিল্পের সঙ্গে মনোযোগী সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ বাড়বে।
এই কাজে শিল্পী, কিউরেটর, পুজো কমিটি, প্রশাসনের মধ্যে পরিকল্পনার শুরু থেকেই সমন্বয় প্রয়োজন। শিল্পীর ধারণা বাস্তবায়িত হয় নির্দিষ্ট স্থান ও বাজেটের মধ্যে। সেই সঙ্গে থাকে সময়সীমা এবং নিরাপত্তাবিধি। নির্মাণের পরবর্তী পর্যায়ে এই শর্তগুলি বিবেচনা করলে শিল্পের পরিকল্পনা ও দর্শকের অভিজ্ঞতার মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে। তাই নান্দনিক পরিকল্পনা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা একই প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া উচিত।
২০২৬ সালের পুরস্কারপ্রাপ্ত পুজোগুলির মূল্যায়নও এই আলোচনাকে প্রসারিত করার সুযোগ দেয়। পুরস্কারের মাধ্যমে প্যান্ডেলের স্থাপত্য, নির্মাণকৌশল, বিষয়ের উপস্থাপনা স্বীকৃতি পায়। সেই স্বীকৃতির পাশাপাশি দর্শকের অভিজ্ঞতার গুণমানকেও মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড রূপে বিবেচনা করা দরকার। কোনও প্যান্ডেলের শিল্পমূল্য তার দৃশ্যগত অভিনবত্বে যেমন নিহিত, তেমনই তার বক্তব্য দর্শকের কাছে পৌঁছনোর পদ্ধতিতেও নিহিত।
প্যান্ডেলের ভাষা
চোরবাগানের দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের মূল্যায়ন তার দৃশ্যগত অভিনবত্বের মধ্যেই শেষ হতে পারে না। কোনও প্যান্ডেলের শিল্পভাবনা যতই সৃজনশীল হোক, তার নির্মিত পরিসরে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রথম শর্ত। অন্ধকার বা সংকীর্ণ পথের নান্দনিক ব্যবহার করা হলে তার সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করতে হবে। শিল্পের অভিজ্ঞতা মানুষের জীবনের বিনিময়ে অর্জন করার বিষয় নয়।
শিল্পকে ‘সর্বজনীন’ করার অর্থ শুধু তাকে সর্বসাধারণের সামনে উপস্থিত করা নয়; তার সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি করা। প্যান্ডেলের দর্শকের কাছে শিল্পের বক্তব্য পৌঁছনোর জন্য সময় ও ব্যাখ্যার অবকাশ থাকা দরকার। সেই সুযোগ সীমিত হলে শিল্পের সর্বজনীন উপস্থিতির মধ্যেও তার অর্থ উপলব্ধির ক্ষেত্রে অসমতা তৈরি হতে পারে।
ছোটবেলায় মায়ের মুখে শোনা ‘মণ্ডপ দেখে আসি’ কথাটি এখন ‘প্যান্ডেল দেখে আসি’ হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে দুর্গাপুজোর শিল্পচর্চার দীর্ঘ ইতিহাস ধরা রয়েছে। দেবীকে ঘিরে নির্মিত পরিসর ক্রমশ নিজস্ব শিল্পভাষা অর্জন করেছে। এখন সেই ভাষা পড়ার পদ্ধতিও গড়ে তোলা প্রয়োজন। একটি প্যান্ডেল কীভাবে তার বক্তব্য নির্মাণ করছে এবং দর্শককে সেই বক্তব্য উপলব্ধি করার কতখানি সুযোগ দিচ্ছে, এই প্রশ্নগুলি তার শিল্পমূল্য বিচারের অংশ হওয়া উচিত।
পুজোর শেষে প্যান্ডেল ভেঙে যায়। থেকে যায় তার ছবি, এবং দর্শকের স্মৃতি। কোনও কোনও শিল্পকর্মের ‘অর্থ’ সে মুহূর্তেই ধরা পড়ে; অন্যগুলির ‘অর্থ’ বুঝতে সময় লাগে। ‘দুর্গাপুজোর শিল্পভাষা’ তখনই তার সামাজিক সম্ভাবনা পূর্ণ করতে পারবে, যখন তার নির্মিত বিস্ময় দর্শককে চিন্তার অবকাশ দেবে, এবং সেই অভিজ্ঞতার জন্য নিরাপদ পরিসর নিশ্চিত করবে। দেবীর আগমনের জন্য যে-মণ্ডপ নির্মিত হয়, সেখানে মানুষের জীবন ও শিল্পের অর্থ উপলব্ধি করার অধিকার সমান মর্যাদা পাক।
(মতামত নিজস্ব)
