বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে দেখা যায় অন্যরকম ফুটবল উন্মাদনা! পাড়া-মহল্লায় উড়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা, বিক্রি হয় হাজার হাজার জার্সি। অথচ দেশের ঘরোয়া ফুটবলের মাঠে সেই উন্মাদনার ছিটেফোঁটাও নেই। দর্শকখরা, দুর্বল অবকাঠামো, নিম্নমানের সম্প্রচার আর আর্থিক সংকটে ধুঁকতে থাকা লিগকে ঘিরে এবার বড় স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে পাশে দাঁড়াতে চায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান!
বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ সুপার লিগ (বিডিএসএল) বাস্তবায়িত হলে দেশের ফুটবলে আসতে পারে বড় পরিবর্তন। সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগে আন্তর্জাতিক মানের এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এ লক্ষ্যে বাফুফের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষর হয়েছে। তবে এখনই লিগ শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে দুই পক্ষ।
প্রস্তাবিত লিগের পরিকল্পনায় রয়েছে ১০টি দল। এর মধ্যে ছয়টি দল বিভিন্ন জেলা বা বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করবে ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে। অন্যদিকে দেশের ঐতিহ্যবাহী চারটি ক্লাবও পাবে অংশগ্রহণের সুযোগ। বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে এক সুতোয় বাঁধতে চায় উদ্যোক্তারা। ডাবল রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ঘরোয়া ফুটবলের বর্তমান দুরবস্থা কাটানোর তাগিদ। বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ করিমও স্বীকার করেছেন, দেশের লিগ এখনো প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। তবে প্রস্তাবিত চুক্তিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে নারাজ তিনি। ফাহাদ করিম বলেন, ‘এমওইউ-কে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি আমরা। চুক্তিটি এভাবে করা হয়েছে যাতে বাফুফে আইনগতভাবে বাধ্য থাকবে না এবং ভবিষ্যতে অন্য কেউ এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে এলেও স্বাগত জানাবে। তবে কোনো সংস্থাকে সুযোগ না দিলে তাদের চেষ্টার মূল্যায়ন হবে না বলেই এই সম্পর্কটা আমরা তৈরি করেছি।’
লিগের কাঠামো নিয়ে ফাহাদ করিম আরও বলেন, ‘আমাদের ঘরোয়া লিগ নিয়ে হতাশার শেষ নেই। আমরা দায়িত্বশীল জায়গায় আছি, সেখান থেকে আমাদের অস্বীকার করার উপায় নাই যে ঘরোয়া লিগটা যে জায়গায় থাকার কথা, সেখানে এখনো নিতে পারিনি। ইউকে ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি একটি হাইব্রিড মডেলে লিগ আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা বা বিভাগের নামে নতুন দল আসবে। এএফসি ও ফিফার গাইডলাইন মেনেই সবকিছু করা হবে।’
তবে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে অর্থের জোগান ও বাস্তবায়ন। বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপের নির্বাহী চেয়ারম্যান নাজির আলমের দাবি, তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া খাতে অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠান। কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন সংস্থাসহ অংশীদারদের সম্মিলিত স্পোর্টস পোর্টফোলিও ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। যদিও বিনিয়োগকারীদের নাম কিংবা নির্দিষ্ট বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
নাজির আলমের ভাষায়, এই উদ্যোগ কেবল নতুন একটি টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য নয়। প্রতিষ্ঠিত ক্লাবগুলোর ঐতিহ্য ও সমর্থকদের আবেগ ধরে রেখে নতুন প্রজন্মকে ফুটবলে যুক্ত করাই তাদের লক্ষ্য। একই সঙ্গে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ না দিয়েই বেসরকারি বিনিয়োগে ফুটবলের অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
পরিকল্পনায় রয়েছে স্টেডিয়াম সংস্কার, ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা, নতুন দর্শকগোষ্ঠী তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের সম্প্রচার নিশ্চিত করা। শুধু মাঠের লড়াই নয়, ফুটবলকে একটি বাণিজ্যিক ও বিনোদনশিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিধি আরও বিস্তৃত। ২০৪৪ সালে বাংলাদেশকে অলিম্পিক আয়োজনের উপযোগী করে তোলার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যও জানিয়েছেন নাজির আলম।
তবে বাংলাদেশের ফুটবলে এমন স্বপ্ন এর আগেও দেখা গেছে। ২০১৬ সালে জাঁকজমকপূর্ণভাবে বাংলাদেশ সুপার লিগ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। লোগো উন্মোচন থেকে শুরু করে নানা প্রচার-প্রচারণাও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়ায়নি সেই প্রতিযোগিতা। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত জটিলতায় থেমে যায় উদ্যোগটি। এবার প্রায় এক দশক পর নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ফিরেছে একই ধরনের স্বপ্ন।
এবারের উদ্যোগে অবশ্য বাফুফে শুরু থেকেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সমঝোতা স্মারকটি বাধ্যতামূলক বা একচেটিয়া নয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব গ্রহণ করতেই হবে, এমন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই ফেডারেশনের। আগামী ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা জমা দেবে বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ। সেখানে বিনিয়োগ, দল পরিচালনা, অবকাঠামো এবং প্রতিযোগিতার বিস্তারিত কাঠামো তুলে ধরতে হবে। এরপর বাফুফের পেশাদার ফুটবল লিগ কমিটি পর্যালোচনা করে নির্বাহী কমিটির কাছে সুপারিশ পাঠাবে।
এ প্রসঙ্গে ফাহাদ করিম বলেন, ‘আমি মনে করি তারা যেভাবে পরিকল্পনা করছে, সেটা করা আমাদের প্রেক্ষাপটে বেশ চ্যালেঞ্জিং। তারপরও আমরা ইতিবাচক থাকতে চাই। যখন তাদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পাবো সেটা গভীরভাবে খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাহী কমিটি।’
লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পিকার ব্যারিস্টার মুশতাক আহমেদও এই উদ্যোগ নিয়ে আশাবাদী। তার মতে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমী, ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে দেশের ফুটবলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন একটি অধ্যায়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে বিডিএসএল। তবে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের দাবি কিংবা আন্তর্জাতিক মানের আয়োজনের প্রতিশ্রুতিই শেষ কথা নয়। অতীতে পরিকল্পনার অভাবে মাঠে না গড়ানো সুপার লিগের অভিজ্ঞতা এবারও সামনে থাকবে। তাই ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা এখন ছয় মাসের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবের। শেষ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগের এই স্বপ্ন মাঠে গড়ায়, নাকি আরেকটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হয়-তার উত্তর দেবে সময়!
