Published on
:
3 min read
ODI ক্রিকেটে এত রান উঠছে কী ভাবে? ব্যাটারদের ব্যাটে রানের বন্যা, বোলারদের কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ— এই ছবি কি বদলে দিচ্ছে ওয়ান ডে ক্রিকেটের চেনা হিসেব? পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka) ও ইংল্যান্ডের (England) ত্রিদেশীয় সিরিজ়ের ম্যাচ যেন সেই বিতর্ককেই আরও উস্কে দিল। প্রথমে ব্যাট করে ৪২৯ রান তুলেছিল ইংল্যান্ড। জবাবে ৪৩০ রান তাড়া করে অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে নেয় শ্রীলঙ্কা। শেষ ওভারের পঞ্চম বল পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য ছিল অনিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত জানিথ লিয়ানাগের (Janith Liyanage) ছক্কায় ২ উইকেটে ম্যাচ জেতে শ্রীলঙ্কা। ODI ক্রিকেটের ইতিহাসে এত বড় রান তাড়া করে জয়ের নজির এর আগে ছিল না। তবে এই ম্যাচে শুধু রেকর্ডের ছড়াছড়িই নয়, প্রশ্ন উঠছে— ব্যাটারদের এমন দাপটের সামনে বোলাররা কি ক্রমশ অসহায় হয়ে পড়ছেন?
৮৫৯ রান, ১২৩টি বাউন্ডারি! বদলে যাচ্ছে ওয়ান ডে ক্রিকেটের ছবি?
ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার এই ম্যাচে মোট উঠেছে ৮৫৯ রান। দুই দল মিলিয়ে ৯৩টি চার ও ৩০টি ছক্কা মেরেছেন ব্যাটাররা। ODI ক্রিকেটের ইতিহাসে এক ম্যাচে মোট রানের নিরিখে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচে উঠেছিল ৮৭২ রান। সেই ম্যাচে ৪৩৫ রান তাড়া করে জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।
এ বার ৪২৯ রান করেও জিততে পারল না ইংল্যান্ড। উল্টে ৪৩০ রান তাড়া করে জিতে ODI ক্রিকেটে নতুন নজির গড়ল শ্রীলঙ্কা। এর আগে তাদের সর্বোচ্চ সফল রান তাড়া করে জয়ের নজির ছিল ৩২২ রানের। ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এবং ২০১৭ সালে ভারতের বিরুদ্ধে সেই রান তাড়া করে জিতেছিল তারা। এ বার সেই রেকর্ডকে অনেকটা পিছনে ফেলে দিল শ্রীলঙ্কা।
গত মাসে গুয়াহাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে ৪০৬ রান তাড়া করে জিতেছিল ভারত। সেই ম্যাচকে পিছনে ফেলে এক দিনের ক্রিকেটে সফল রান তাড়ার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এল শ্রীলঙ্কা। অর্থাৎ, অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ম্যাচে চারশোর বেশি রান তাড়া করে জয়ের ঘটনা সামনে আসছে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ব্যাটারদের পক্ষে পরিস্থিতি কি অতিরিক্ত সুবিধাজনক হয়ে যাচ্ছে? পিচ, মাঠের আকার, শিশির এবং আধুনিক ব্যাটের প্রভাব— সব কিছু নিয়েই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ব্রুকের দ্বিশতরানও বাঁচাতে পারল না ইংল্যান্ডকে
এ দিন প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডকে বড় রানের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন টম ব্যান্টন। পরে জো রুটের সঙ্গে জুটি বেঁধে ম্যাচের ছবিটাই বদলে দেন অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক (Harry Brook)। মাত্র ৭৫ বলে শতরান করার পর মাত্র ১১৪ বলে দ্বিশতরান পূর্ণ করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ২১টি চার ও ১০টি ছক্কা। ODI ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্রুততম দ্বিশতরানের নজির গড়েন ব্রুক। এর আগে এই রেকর্ড ছিল ভারতের শুবমান গিলের। উইল জ্যাকসও ২৫ বলে অর্ধশতরান করে ইংল্যান্ডের রানকে আরও এগিয়ে দেন। শেষ ১০ ওভারে ১৫৬ রান তোলে ইংল্যান্ড। চার উইকেট হারিয়ে তাদের স্কোর দাঁড়ায় ৪২৯।
কিন্তু ব্রুকের এমন অবিশ্বাস্য ইনিংসও শেষ পর্যন্ত বিফলে গেল। তাঁর ২০২ রানের ইনিংস এক দিনের ক্রিকেটে পরাজিত দলের কোনও ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান। এর আগে ২০০৯ সালে জ়িম্বাবোয়ের চার্লস কভেন্ট্রি অপরাজিত ১৯৪ রান করেছিলেন। ব্রুকের দ্বিশতরান ইংল্যান্ডকে জেতাতে পারল না, বরং তাঁর নামের পাশে যোগ হল এক অনিচ্ছাকৃত রেকর্ড।
রথনায়েকে-শনাকার পাল্টা আক্রমণে ভাঙল ইংল্যান্ডের স্বপ্ন
৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে শ্রীলঙ্কা। মাত্র ২৪ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বসেছিল তারা। কিন্তু সেখান থেকে ম্যাচের হাল ধরেন পবন রথনায়েকে (Pavan Rathnayake) এবং অবিষ্কা ফার্নান্দো (Avishka Fernando)। দু’জনে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে শ্রীলঙ্কাকে লড়াইয়ে ফেরান। ৮৩ বলে ৯৭ রান করে আউট হন ফার্নান্দো। অন্য দিকে, ১০৬ বলে ১৩০ রানের দুরন্ত ইনিংস খেলেন রথনায়েকে। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ১৫টি চার ও তিনটি ছক্কা।
এর পর ম্যাচের গতি আরও বাড়িয়ে দেন দাসুন শনাকা (Dasun Shanaka)। মাত্র ৫০ বলে ৯৭ রান করেন তিনি। ছ’টি চার ও আটটি ছক্কায় সাজানো ছিল তাঁর ইনিংস। শনাকা এবং রথনায়েকের আক্রমণে ইংল্যান্ডের বোলাররা কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েন। শেষ আট ওভারে শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন ছিল ১০০ রান। সেখান থেকেও জয়ের আশা ছাড়েনি তারা।
শেষ দিকে দায়িত্ব নেন লিয়ানাগে। মাত্র ২৭ বলে অপরাজিত ৬১ রান করে দলকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন তিনি। শেষ ওভারে ইংল্যান্ডের জশ টাং পরপর দু’টি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ফেরার আশা জাগিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়ে শ্রীলঙ্কার জয় নিশ্চিত করেন লিয়ানাগে। এই ম্যাচে ইংল্যান্ডের বোলারদের মধ্যে স্যাম কারেনের অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ। ৯ ওভারে ১০৩ রান দেন তিনি। অন্য দিকে, শেষ দিকে উইকেট তুলে নিয়েও দলকে জেতাতে পারেননি টাং।
চারশোর বেশি রান করেও জয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না— রাওয়ালপিন্ডির ম্যাচ আরও এক বার সেই বাস্তব সামনে আনল। এক দিকে ব্যাটারদের অবিশ্বাস্য আগ্রাসন, অন্য দিকে বোলারদের রান আটকাতে না পারার সমস্যা। সব মিলিয়ে এক দিনের ক্রিকেটে চারশো রানও এখন আর জয়ের নিশ্চয়তা নয়। প্রশ্ন উঠছে, এই রানবৃষ্টিই কি ক্রিকেটকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে, নাকি ব্যাটার ও বোলারদের লড়াইয়ের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে?