ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০ ছাড়িয়ে গেল। এক মাস আগে ছড়িয়েছে ৬৪ জেলায়। প্রতিদিন শ শ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। জনস্বাস্থ্যবিদরা বারবার বলছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক হওয়ার কথা ছিল না। কারণ ডেঙ্গু প্রতিরোধযোগ্য। পৃথিবীর অনেক দেশে সফলভাবে প্রতিরোধ সম্ভব করেছে। আমরা পারিনি। এমনকি প্রায় একই ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশের জনপদ ঢাকা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা। কলকাতায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে। আমাদের নেই। উল্টো মহামারী আকার ধারণ করেছে।
অক্টোবর ১৩ তারিখ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এক লক্ষ তিন হাজার তিনশত ছিয়ানব্বই জন। বিশ্লেষণ করে দেখা যায় প্রতি মাসে আক্রান্তের হার বাড়ছে ভয়ানকভাবে। আইইডিসিআর বলছে বাংলাদেশের ডেঙ্গুর চারটি ধরনই সক্রিয়। উপরের কয়েকটি বাক্যই যথেষ্ঠ ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সম্বন্ধে আঁচ করতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যু নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ, আলোচনা-সমালোচনা হলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো সরকারকেই আন্তরিক হতে দেখা যায়নি। আমার মতো সামান্য লেখকও কয়েকটি লেখা লিখেছি এ নিয়ে। কোনো কাজ হয়নি।
আমাদের কথা বাদ দেন। জনস্বাস্থ্যবিদরা কী বলছেন সেদিকে নজর দিতে পারত সরকার। দেয়নি। তারা বলেছেন ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা নিধনের মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। আর ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। এই দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। কিন্তু সমন্বয় দেখা যায়নি।
উল্টো এই জনস্বাস্থ্য সমস্যাকে উপেক্ষা করেছে চার চারটি সরকার। ঢাকা শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগতত্ত্ববিদ ড. কে কৃষ্ণমূর্তিকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। অনেকের সঙ্গে কথা বলে ওই বিশেষজ্ঞ ২২ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা দলিল তৈরি করেন। উদ্দেশ্য আক্রান্তের হার ও মৃত্যু কমানো। দলিলে রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য-শিক্ষা-যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে র্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন করার পরামর্শ দেওয়া হয়ছিল। ১২টি মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের সাথে যুক্ত হতে বলা হয়েছিল। ২০১৯ সালের মধ্যে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা ছিল। কিচ্ছু হয়নি।
২০১৭ সালের সুপারিশের নয় বছর পর দেশবাসী এডিস মশা নিধনের জন্য পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন পেল। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এর উদ্বোধন করলেন। এরপর দেখা যাচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক জনগণের টাকা খরচ করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। দেখাচ্ছেন ‘সেই রকম’ কাজ করছেন তারা। মাঝখানে কিছু কাজ যে হয়নি তা নয়। বরাদ্দ হয়েছে যথারীতি। আর লুটপাট হয়েছে চমৎকারভাবে। এ ব্যাপারে আবার সব সরকারের কাছের লোকেরা একেবারে খালাতো ভাই। কোনো বিরোধ নেই। ফগিং করা হয় মাঝে মাঝে। এই কাজ করে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো খুব মজা পায়। লোক দেখানো হয় যে! কিন্তু ফগিং দিয়ে যে কাজ হচ্ছে না সেটা বুঝতে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের কত হাজার বছর যে লাগবে আল্লাহ মালুম। ফগিং এর ধোঁয়ায় মশার কিছুই হয় না। বরং উল্টো ড্রেন থেকে উড়ে এসে ঘরের ভেতরে জায়গা করে নেয়। দুই বছর আগে শোনা গেল মশা নিধনে ড্রোন ব্যবহার করা হবে। তার আগে শোনা গেল মশা নিধন করতে নাকি মশা আমদানি করা হচ্ছে। আমদানিকৃত মশা আমাদের স্থানীয় মশাদের সাথে ‘মেলামেশা’ করলে আর মশার বিস্তার হবে না।
আরও পড়ুন
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা একসময় খুবই খারাপ ছিল। সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল ত্রিস্তরীয়। ফগার মেশিন দিয়ে ফগিং না করে মশার প্রজনন কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে গবেষণাগার। ভিয়েতনামে চালু করা হয়েছে ই-ডেঙ্গু সফটওয়্যার। এটি মুঠোফোনে অ্যাপ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। সিঙ্গাপুর জোর দিয়েছে নির্মাণ কাজে তদারকি। ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি (এনইএ) এডিস মশা নির্মূলের জন্য ‘গ্র্যাভিট্র্যাপ’ নামের একটি বিশেষ ব্যবস্থা চালু করেছে। ইন্দোনেশিয়া ‘ওলবাকিয়া’ নামে এক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলতা পেয়েছে। ‘ওলবাকিয়া’ প্রযুক্তি ব্যবহারের পর বিশ্ব মশা কর্মসূচি ডাব্লিউ এমপি জানিয়েছে, বালি দ্বীপ এখন সম্পূর্ণ ডেঙ্গুমুক্ত। ব্রাজিল ডেঙ্গু আক্রান্তের দিক থেকে শীর্ষ দেশ। তারা ‘সিনান’ নামের তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে সফলভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হয়েছে।
অনেক খারাপ খবরের মধ্যে একটি ভালো খবর হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মাস্ট ক্লাউডনেট নামের একটি যন্ত্র আবিষ্কার করে ক্যাম্পাসে এর পরীক্ষা করে দেখেছে সফলতার হার ৮১ শতাংশ। গবেষণাটি এবছর আইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা ২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটির আবাসিক এলাকায় ১০-১৫টি যন্ত্র বসিয়ে পরবর্তী মাঠ-পরীক্ষা করবে। আমরা তো টেনে ধরে নিচে নামানোর জাতি। এই সম্ভাবনাকেও গলা টিপে হত্যা করা হবে কি-না কে বলতে পারে। এসব পদক্ষেপগুলোর মধ্যে কোনটি আমাদের জন্য প্রযোজ্য তা বের করতে হবে। সমস্যাটি সমাধানের জন্য বিভিন্ন মেয়াদী (স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ) পরিকল্পনা ও সমন্বিত কৌশলগত কার্যক্রম হাতে নিতে হবে । মনে রাখতে হবে ডেঙ্গু কিন্তু আমাদেরকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
লেখক : কবি-কথাসাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক, ০১৭১৯-৪৫৫৪৯২
_1792216728.png&w=1440&q=75)