ইয়েমেনের হুতিদের হামলার মুখে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে মিসর। রিয়াদের সুরক্ষায় মিসরের সশস্ত্র বাহিনীকে মোতায়েনের অনুমতি চেয়ে পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে এ নিয়ে ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।
পার্লামেন্ট সবুজ সংকেত দিলে আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি সরাসরি আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিমান হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে এখন দুই অঙ্কের উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বহু পরিবারের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে।
গত শনিবার এক ভাষণে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি পার্লামেন্টের কাছে এ বিষয়ে অনুমোদন চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের ভাইদের আমরা কখনোই ভুলব না।’ সৌদি আরবের নেতাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের রক্ষায় আমরা যেকোনো পদক্ষেপ নেব।’
ইরান যুদ্ধে তেহরানের হামলার শিকার হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো মিসরও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশীদার। তবে চলমান সংঘাত সেই নিরাপত্তাব্যবস্থাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে মিসরের অবস্থান কী
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মিসর বেশ সংযত অবস্থান বজায় রেখেছিল। তবে সিসির সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই অবস্থানে স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এত দিন মিসর উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোর প্রতি বারবার জোরালো সমর্থন জানালেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কোনো প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
গত মে মাসে সিসির সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময় দেশটিতে মিসরের রাফাল যুদ্ধবিমান মোতায়েন থাকার তথ্য সামনে আসে। আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বিষয়টি উঠে এলেও মিসরের সংবাদমাধ্যমগুলো সফরের প্রতিবেদনে এ নিয়ে কিছু জানায়নি।
পরে আগস্টে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। মিসর ওই চুক্তিতে যোগ দেয়নি। তবে সেই সময় চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছিল দেশটি। সৌদি আরবের তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হুতিরা হামলা বৃদ্ধি করার পর মিসরের অবস্থান বদলাতে শুরু করে।
গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিসর সফর করেছেন। সফরে তিনি বাব আল-মানদেব প্রণালি ও লোহিত সাগরে অবাধ ও নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। লোহিত সাগরের তীরে মিসর ও সৌদি আরব—দুই দেশেরই দীর্ঘ উপকূল রয়েছে।
কেন সৌদির পাশে দাঁড়ানো মিসরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
দীর্ঘদিন ধরে মিসরের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এসব দেশে কর্মরত মিসরীয় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।
খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে এখন দুই অঙ্কের উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বহু পরিবারের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে সিসি সরকারের প্রধান আর্থিক সহায়তাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
২০১৩ সালে মিসরের সেনাবাহিনী মুসলিম ব্রাদারহুডের জ্যেষ্ঠ নেতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। এর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো মিসরকে অনুদান, বিনিয়োগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আমানত হিসেবে হাজার হাজার কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
প্রেসিডেন্ট সিসি তাঁর ভাষণে সেই সহায়তার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘সেই কঠিন সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভাইয়েরা যেভাবে মিসরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আমরা তা কখনোই ভুলব না।’
মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি মাসেই ব্যাংকটিতে থাকা সৌদি আরবের ৫৩০ কোটি ডলারের আমানতের মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে। এর সঙ্গে কায়রোকে অতিরিক্ত ২৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সুদও পরিশোধ করতে হবে।

নিরাপত্তা নিয়ে মিসরের উদ্বেগ আসলে কতটা
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাঝুঁকিও কায়রোকে এ সংঘাতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গত জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী মিসরীয় বন্দরনগরী দামিয়েত্তায় দুটি গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ওই হামলাই স্পষ্ট করে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত থেকে মিসর নিজেকে পুরোপুরি আলাদা বা নিরাপদ রাখতে পারবে না।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেন, ‘আমার মনে হয়, কায়রো বুঝতে পারছে, তারা অনির্দিষ্টকাল এই সংঘাতের দর্শক হয়ে বসে থাকতে পারবে না।’ হেলিয়ারের মতে, মিসরীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তাঝুঁকি এখন মূলত একই সূত্রে গাঁথা।
লোহিত সাগরে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও মিসর ও সৌদি আরবের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানিতে বাধা তৈরি হওয়ায় লোহিত সাগর দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে মিসর সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে প্রতিবছর শত শত কোটি ডলার মাশুল আদায় করে। ফলে দুই দেশের অর্থনীতির জন্যই লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বজায় রাখা অপরিহার্য।
মিসরীয় রাজনৈতিক গবেষক ও সাংবাদিক শেরিফ আরেফ এই অভিন্ন স্বার্থের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষা করা এখন খোদ মিসরের জাতীয় নিরাপত্তারই একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
মিসরের সামরিক সক্ষমতা কেমন
সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে মিসরের হাতে। দেশটির কয়েক লাখ সক্রিয় সেনাসদস্য রয়েছেন; পাশাপাশি রয়েছে বড় আকারের স্থল, নৌ ও বিমানবহর।
মিসর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করে। দেশটির বিমানবাহিনীতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬, ফ্রান্সের রাফাল এবং রাশিয়ার তৈরি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান।
এর বাইরে কায়রো প্রতিবছর ওয়াশিংটনের কাছ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পায়। এই অর্থ দিয়ে তারা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে কায়রোর ‘সহায়ক ভূমিকার’ কথা বিবেচনা করে চলতি বছর দেশটিকে দেওয়া সামরিক সহায়তার একটি অংশের ক্ষেত্রে মানবাধিকারসংক্রান্ত শর্ত শিথিল করেছে ওয়াশিংটন।

বিদেশের মাটিতে বড় সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও মিসরের রয়েছে। ২০১১ সালে গণ-অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতনের পর সিনাই উপদ্বীপে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযান চালায় মিসরের সেনাবাহিনী।
২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর সামরিক অভিযানেও বিমান ও নৌবাহিনী নিয়ে অংশ নেয় মিসর। এ ছাড়া লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিভিন্ন অবস্থানে বিমান হামলা চালায় দেশটি।
তবে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মিসর বিদেশের মাটিতে বড় পরিসরে আর কোনো স্থলসেনা মোতায়েন করেনি। ওই যুদ্ধে কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে হটাতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ জোটে অংশ নিয়েছিল মিসরীয় সেনারা।
তারও প্রায় তিন দশক আগে ইয়েমেনে সেনা পাঠিয়েছিলেন মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের। তবে সেই ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানের জন্য মিসরকে বড় খেসারত দিতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অনেক বিশ্লেষক এ ঘটনাকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়ার সঙ্গে তুলনা করেন।

মিসর কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে পারে
প্রেসিডেন্ট সিসি তাঁর ভাষণে কিংবা পরবর্তী কোনো সরকারি বিবৃতিতে ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করেননি। এমনকি শেষ পর্যন্ত কোনো সেনা পাঠানো হবে কি না, তা–ও নিশ্চিত করে জানানো হয়নি।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, মিসর সরাসরি ইয়েমেনের ভেতরে স্থলসেনা মোতায়েন করবে না বললেই চলে।
মিসরের অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আরব ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রধান সমির রাঘেব মনে করেন, মিসরের এই ভূমিকা মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা ও নৌ সহায়তার মধ্যেই সীমিত থাকবে। রাঘেব বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মতো হুমকি প্রতিহত করতে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও বিমানবাহিনীর প্রয়োজন।’
রাঘেবের মতে, লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জলদস্যুতা রোধ এবং সৌদি উপকূল পাহারা দেওয়ার কাজেও মিসরের নৌবাহিনী অংশ নিতে পারে।
তবে যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগ মনে করেন, মিসরের মতো বড় সামরিক শক্তি যুক্ত হলেই হুতি সমস্যার রাতারাতি সমাধান মিলবে না।

ক্রিয়েগ বলেন, হুতিদের মোকাবিলা করা কঠিন। কারণ, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে, বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থেকে এবং ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু বোমা হামলা চালিয়ে মিসর এই সংকট মেটাতে পারবে না।
ক্রিয়েগ আরও বলেন, মিসর বড়জোর সৌদি আরবের প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, লোহিত সাগরে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে পারে এবং প্রতিরক্ষার যৌথ দায়ভার ভাগ করে নিতে পারে। আর এর মধ্য দিয়ে মিসরকে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হতে পারে।
