Published on
:
2 min read
এই সময়, বর্ধমান: ফাইমোসিস অস্ত্রোপচারে চার বছরের শিশু অরণ্য রায়ের মৃত্যু ঘিরে ভয়াবহ অনিয়মের ঘটনায় তদন্ত আরও এগোল। ভুয়ো চিকিৎসক শেখ সায়দুল হকের পরে এ বার গ্রেপ্তার হলেন অ্যানাস্থেটিস্ট বনজকুমার দে। ধৃতকে মঙ্গলবার বর্ধমান আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাঁকে চার দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন। সোমবার দুপুরে গােপন সূত্রে খবর পেয়ে বর্ধমান থানার সাব-ইনস্পেক্টর বাণীশঙ্কর সিংহ মহাপাত্র বীরভূমের শান্তিনিকেতনের এক রিসর্টে অভিযান চালিয়ে বনজকে পাকড়াও করেন। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ রেখেছিলেন বর্ধমানের শ্যামলাল রাজবাড়ি এলাকার বাসিন্দা বনজ। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না।
আদালতে তদন্তকারী আধিকারিক জানান, তাঁকে বর্ধমান থানায় নিয়ে আসার পরে পুলিশি জজিজ্ঞাসাবাদে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন বনজ। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৮০ ধারা অনুযায়ী তাঁর বক্তব্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে বনজের দেওয়া তথ্য লিখিত ভাবে আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। জানা গিয়েছে, পুলিশকে বনজ জানিয়েছেন, বর্ধমানের নবাবহাটের ওই নার্সিংহোমে গত ২ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টা নাগাদ শেখ সায়দুল হক যখন অরণ্যর অস্ত্রোপচার শুরু করেন, তখন তিনি অ্যানাস্থেটিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অপারেশন শেষ হতেই পৌনে দুটো নাগাদ শিশুটিকে অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) রেখেই তিনি নার্সিংহোম থেকে চলে যান। দুপুর পৌনে তিনটেয় নার্সিংহোম থেকে অরণ্যর শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা জানিয়ে ফোন করা হলেও অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি ফেরেননি।
তাঁর বদলে চিকিৎসক স্বর্ণমুকুল সাহাকে শিশুটিকে দেখার অনুরোধ জানান। অ্যানাস্থেটিস্ট হিসেবে রোগীর সম্পূর্ণ জ্ঞান না-ফেরা পর্যন্ত উপস্থিত থাকা যে তাঁর মৌলিক দায়িত্ব ছিল, তা স্বীকার করেছেন তিনি।
এ দিন বনজের গ্রেপ্তারের খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন অরণ্যর মা শিল্পা রায়। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, 'সে দিন অপারেশন করার পর পরই লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি করে নেমে একপ্রকার পালিয়ে গিয়েছিলেন বনজ দে। আসলে তখনই তিনি জেনে গিয়েছিলেন যে আমার অরণ্য শেষ হয়ে গিয়েছে। পরে স্বর্ণকমল সাহা এসে দেখে কোনও কথা না বলে চলে যান। উনি অপরাধী নন, কিন্তু উনি এই ঘটনার সাক্ষী।' অভিযুক্তদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও যোগ করেন, 'আমি চাই সায়দুল আর বনজের হাত দুটো কেটে বাদ দেওয়া হোক। ওঁদের ফাঁসি চাই না। চাই ওঁরা তিলে তিলে শেষ হোক।'
তবে এই ঘটনায় অভিযুক্তদের কয়েকজন এখনও অধরা বলে জানিয়েছেন শিল্পা। তাঁর বক্তব্য, 'নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের কয়েক জনকে এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি। ওঁদের মধ্যে একজন নিজেকে থানার আইবি বলে পরিচয় দিয়ে আমাদের টাকা অফার করেছিলেন। বলেছিলেন, ওঁদের সঙ্গে পুলিশের সব সেটিং করা আছে। আমাদের কত টাকা চাই, জানতে চেয়েছিলেন। ওই লোকটার নাম পুটাই। ভালো নাম জানি না। কিন্তু আমরা কি আমার সন্তানকে নার্সিংহোমে বিক্রি করতে গিয়েছিলাম?'
সায়দুলের ধরা পড়ার ছ'দিনের মাথায় অ্যানাস্থেটিস্ট বনজের গ্রেপ্তারি প্রসঙ্গে পূর্ব বর্ধমান জেলার পুলিশ সুপার মিস পুষ্পা বলেন, 'দেখুন এটা পুলিশের টিম ওয়ার্ক। আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করেছি। অভিযুক্তদের ধরে আদালতে হাজির করানো হয়েছে। আমরা আদালতে সব তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরব।' সূত্রের খবর, এই মামলায় স্পেশাল পিপি নিয়োগ ও কাস্টডি ট্রায়ালের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, দুর্গাপুরের আঞ্চলিক ফরেন্সিক বিভাগ থেকে ওই শিশুর দেহের রাসায়নিক পরীক্ষার ভিসেরা রিপোর্ট না-পৌঁছনোয় মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ নিশ্চিত করতে এখনও অপেক্ষা করতে হচ্ছে পুলিশকে।