Published on
:
2 min read
যোগেনদা চলে গেছেন, ভাবতেই পারছি না। খবরটা শোনার পর থেকে বুকটা ধড়ফড় করছে। যোগেনদার মতন একজন মানুষ যিনি আমাদের বাংলার শিল্পকে, শুধু বাংলা শিল্প না, ভারতীয় শিল্পকে যে ভাবে সারা পৃথিবীর বুকে আঁচড় কেটে গিয়েছেন, সেটা বর্ণনা করার ভাষা নেই। সহজাত ভাবে বলা যায়, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ করেছিলেন, সেখান থেকে যোগেনদা শুরু করেছিলেন। এটা বিশাল একটা যাত্রাপথ।
যোগেনদা আসলে ড্রয়িং করেননি, আঁচড় কেটে গেছেন এই সোসাইটির বুকে। একটা নতুন ধারার জন্ম দিয়েছেন। আমাদের গ্রাম বাংলার সহজাত শিল্পে রঙের যে প্রভাব, সেই প্রভাবটা ওঁর ছবিতে ছিল। সামাজিক যে ছবিগুলো উনি এঁকেছিলেন, সেগুলির সাবজেক্টগুলো খুব জটিল হয়ে গিয়েছিল।
দেখা খুব কম হতো আমার সঙ্গে। উনি আমার ছবি যে খুব একটা পছন্দ করতেন, তা নয়। আমার কাজ নিয়ে সরাসরি আলোচনা হতো। মাঝেমাঝেই যোগেনদা বলতেন, সনাতন তোমার এই ধরনের কাজ আমার পছন্দ নয়। কিন্তু আমি যখন ওই চারকোলের ড্রয়িংগুলো করতাম। সেগুলি খুব পছন্দ করতেন। আমি একটা আন্ডারগ্রাউন্ড নামে ডার্ক লাইট নামে একটা শো করেছিলাম। পরবর্তীকালে আমার ওই চারকোল ড্রয়িং নিয়ে বলতেন যে, ‘আসলে আমরা তো শুধু ড্রয়িং পেন্টিং এর মধ্যে আবদ্ধ ছিলাম এবং আছি। তুমি এত রকম ভাবে কাজ করো, অনেকরকম পথ খুঁজে নিয়েছো, ভালোলাগে।‘ এই সব নিয়ে আলোচনা হতো।
দীর্ঘদিন ধরে উনি অসুস্থ ছিলেন। আমরা অভিভাবকহীন হলাম। আমি ওঁর থেকে শিখেছি যে একলা চলতে হয় যে কোনও সময়ে। আমার পথ তো ভীষণ একলা চলার। আমার এই স্রোতের বিপরীতে হাঁটা উনি এপ্রিশিয়েট করতেন।বার বার বলতেন, একা হাঁটা খুব সহজ কাজ নয়। দেখা হলে বলতেন ‘সনাতন আমরা যে এত সহজ করে বলি, আসলে ব্যাপারটা তো খুব সহজ নয়।’ মানে উনি হয়তো একটা খুব সুন্দর ড্রয়িং করে দিলেন একটা রেখার টানে। যত সহজে উনি ড্রয়িংটা করলেন, এই সহজিয়া পথটা কিন্তু দীর্ঘদিনের।
যোগেনদার ছবি দেখলে বোঝা যেত যে কার আঁকা। যোগেনদার নিজস্ব একটা স্টাইল আছে। আমি এই নিজস্ব স্টাইলে বিশ্বাস করি না।। সাবজেক্ট আমাকে চেঞ্জ করে দেয় প্রতি মুহূর্তে। হয়তো ড্রয়িং করে বোঝাতে পারছি না কোনও জিনিস। সেক্ষেত্রে তখন আমাকে এমন কোনও সাবজেক্ট বা অন্য ধরনের মিডিয়াম আর্টের সম্মুখীন হতে হতো। এটাই আমি করতাম। ওঁর সঙ্গে এটাই মিলত না আমার। এই বিষয়টি নিয়ে মতানৈক্য ছিল। মতে মিলত না বলে যে ওঁর সঙ্গে আমার অন্য কোনো রকম সমস্যা ছিল, ব্যাপারটা তা নয়।
কিছু কিছু বিষয়ে জায়গায় উনি আমাকে ভীষণ ভাবে সাপোর্ট করতেন। আমার এখনও কানে বাজে যোগেনদার একটা কথা, ‘সনাতন, তুমি তো তোমার নিজের মতন করে এগিয়ে যাও।’ আমি স্রোতে গা ভাসাইনি বলেই যোগেন দা আমায় বড্ড বেশি পছন্দ করতেন। অভিভাবকহীন হলাম। যোগেনদা চলে গিয়ে, আমাদের অনেক দায়িত্ব দিয়ে গেলেন।
