নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে বিপুল জয় উদ্যাপন করতে কলকাতায় বিজয় মিছিল করল বিজেপি। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং শাসকদলের রাজ্য সভাপতি একযোগে নেতৃত্ব দিলেন সেই মিছিলের। শেষে ভিক্টোরিয়া হাউসের পাশে বাঁধা মঞ্চ থেকে ভাষণও দিলেন দুই নেতা। প্রধানমন্ত্রীর কথায় যখন ‘ডবল ইঞ্জিন’ হয়েছে, তখন মুখ্যমন্ত্রীর কথায় কলকাতা-হাওড়ায় ‘ট্রিপল ইঞ্জিন’ হোক— এমনই আহ্বান জানাল সে মঞ্চ। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী যেখানে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, সেখানে বিজেপি কী ভাবে জমায়েত করল? প্রশ্ন তুলেছে মমতা তৃণমূল। বিজেপি অবশ্য তাতে গুরুত্ব দিতেই নারাজ।
উত্তর কলকাতার মুরলীধর সেন লেনে বিজেপির পুরনো রাজ্য দফতরের সামনে থেকে সোমবার বিজয় মিছিল শুরু করে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ছাড়াও মিছিলে সামনের সারিতে ছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনসল। ছিলেন তিন রাজ্য সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতো, লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং শশী অগ্নিহোত্রী। ছিলেন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে জয়ী হাসিরানি রথ এবং শাখারভ সরকারও। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে মিছিলশেষে জমায়েতের স্থান হিসেবে বাছা হয়েছিল আয়কর ভবনের সামনের অংশকে। অর্থাৎ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতি বছর যেখানে ২১ জুলাইয়ের জমায়েত করতেন।
মুখ্যমন্ত্রী সোমবার নিজের ভাষণে কলকাতার পুর নির্বাচনের প্রচার কার্যত শুরু করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘মোদীজির কথায় আপনারা ডবল ইঞ্জিন (কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার) দিয়েছেন। এ বার মুখ্যমন্ত্রীর কথায় ট্রিপল ইঞ্জিন দিতে হবে। হাওড়া, কলকাতা দিতে হবে, কথা দিন।’’ শুভেন্দুর কথায়, ‘‘আমি নন্দীগ্রামে গিয়ে এই রকম ভাবে বলেছিলাম— ফলতাকে হারাতে হবে। আজ রাজপথে দাঁড়িয়ে আপনাদের কাছে চাইছি। হাওড়া, কলকাতা দেবেন তো? সব ওয়ার্ডে পদ্ম ফুটবে তো?’’
যে উপনির্বাচনের জয় উদ্যাপন করতে এই কর্মসূচি, সেই উপনির্বাচন প্রসঙ্গে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক বলেন, ‘‘রক্তপাত নেই, বোমাবাজি নেই, বুথ দখল নেই, জেসিবি দিয়ে বাড়ি ভাঙা নেই, গণধর্ষণ নেই, অগ্নিসংযোগ নেই, প্রার্থীর উপরে আক্রমণ নেই। আসলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ২০২৬ সালে একটি পরিবর্তন করেছেন। সে পরিবর্তন হল একদলীয়, একচেটিয়া রাজনৈতিক একাধিপত্য থেকে মুক্তির।’’ সাড়ে চার মাসের সরকার যে কাজ পশ্চিমবঙ্গে করে দেখিয়েছে, তারই প্রতিফলন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ভোটের ফলাফলে দেখা গিয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
শমীক এবং শুভেন্দু, দু’জনেই সোমবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দাবি করেছেন যে, নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের উপনির্বাচনে সংখ্যালঘুরা বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন। শমীক বলেন, ‘‘এই জয় গোটা সমাজে সুদূরপ্রসারী বার্তা নিয়ে যাবে। উন্নত পশ্চিমবঙ্গ, বিকশিত পশ্চিমবঙ্গের বার্তা নিয়ে যাবে। ঘরের ছেলে ঘরের ভাত পাবে, আর বাইরে যাবে না।’’ সে কথা মাথায় রেখেই সংখ্যালঘু সমাজ বিজেপি-কে ভোট দেওয়া শুরু করেছে বলে শমীকের মত। শুভেন্দু বলেন, ‘‘একটা ধারণা তৈরি করে রাখা হয়েছিল যে, বিজেপি শুধু হিন্দুদের ভোটে নির্বাচিত হয়। হ্যাঁ, এটা ঘটনা। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল দেখলে তাই মনে হয়। একটা সম্প্রদায়কে বলে দেওয়া হয়েছিল, বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের ধর্মপালন আটকে দেওয়া হবে, তাদের বাংলাদেশে চলে যেতে হবে। কিন্তু তারা দেখেছে, তারা ভোট না দেওয়া সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদীজির নেতৃত্বে বিজেপির বিজয়রথ আটকানো যায়নি। তাই তারা এখন মূল স্রোতে এসে উন্নয়ন, নবনির্মাণের লক্ষ্যে একজায়গায় দাঁড়িয়েছেন।’’ রেজিনগরের মতো সংখ্যালঘু প্রধান আসনেও মমতা তৃণমূলের প্রার্থী যে জামানত খুইয়েছেন, শুভেন্দু সে কথা মনে করিয়ে দেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘‘ওরা ভোটের আগে বাঙালি-অবাঙালি করেছিল। জাতের নামে ভাগ করতে চেয়েছিল। পাহাড়ে ১১টা আলাদা আলাদা বোর্ড করে ভাগাভাগি করেছিল। মতুয়া বাড়িতে গোলমাল লাগিয়ে দিয়েছিল। সাময়িক ফল পেয়েছিল। তার বিরুদ্ধে এ বার ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করে আমরা ফল পেয়েছি।’’
অন্য দিকে, বিজেপির জমায়েতের স্থান নিয়ে মমতা তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে। চলতি বছরে ২১ জুলাই তৃণমূলকে ওই জায়গায় শহিদ দিবস পালন করার অনুমতি দেয়নি পুলিশ। ২০১৮ সালে একটি মামলায় আদালতের নির্দেশে ওই এলাকায় জমায়েত নিষিদ্ধ বলে জানিয়ে পুলিশ অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে প্রস্তাবিত মঞ্চের জন্য কুণাল ঘোষেরা রাস্তায় নেমে ফিতে দিয়ে মাপামাপি করেছিলেন বলে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের হয়েছিল। সে কথা উল্লেখ করে বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল সোমবার প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘কী করে ওখানে বিজেপি মঞ্চ বাঁধতে পারল? আদালতের নির্দেশে ওখানে জমায়েত যদি নিষিদ্ধ হয়ে থাকে, তা হলে বিজেপি মঞ্চ বাঁধল কার অনুমতিতে?’’ কুণালের কথায়, ‘‘আমরা ফিতে দিয়ে মাপামাপি করেছিলাম বলে আমাদের বিরুদ্ধে তো অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। তা হলে বিজেপি-কে ওখানে মঞ্চ বাঁধতে দেওয়া হল কেন?’’ এ বিষয়ে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সবক্ষেত্রেই আইন ভাঙার প্রতিযোগিতা চলছে। ওরা সরকারে আছে, যা ইচ্ছা করতে পারে।’’ অন্য দিকে, বিজেপির তরফে উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ বলেন, ‘‘তৃণমূলকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে। জনতার রায়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অপ্রাসঙ্গিক তৃণমূল নেতারা কী উল্টোপাল্টা বকছেন, তা নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই।’’
