অতিরিক্ত সাজসজ্জা, ঋতুর সঙ্গে মিলিয়ে বাহুল্য বা একই ধরনের আসবাবের বদলে ঘরে পরিমিতিবোধ, প্রাকৃতিক উপকরণ ও ব্যক্তিগত রুচিই আনতে পারে নতুনত্ব।
পরিচিত কয়েকটি জিনিসের বিন্যাস পরিবর্তন, অপ্রয়োজনীয় উপকরণ সরিয়ে রাখা এবং রং ও কাপড়ের ব্যবহারে সামান্য পরিবর্তনই ঘরের সাজের রূপ বদলে যথেষ্ট।
“অন্যদিকে কিছু সাজ ঘরকে কৃত্রিম, অগোছালো বা একঘেয়ে করে তুলতে পারে”, বলেন ফ্যাশন ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেডিয়েন্ট ইনস্টিটিউট অব ডিজাইন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও অন্দরসজ্জাবিদ গুলশান নাসরিন।
ছোটখাটো জিনিসের ভিড় নয়
বসার ঘরের তাক, টেবিল বা দেয়ালের সামনে ছোট ছোট শোপিস, পুতুল, ফুলদানি ও নানা রকম সাজের উপকরণ সাজিয়ে রাখাই ঘরের মূল সৌন্দর্য।
কারণ আলাদা করে প্রতিটি জিনিস সুন্দর হলেও সব একসঙ্গে রাখলে ঘরের কোনও একটি অংশ অতিরিক্ত ভারী দেখাতে পারে। এতে চোখ বিশ্রাম নেওয়ার মতো খালি জায়গা পায় না, আর পছন্দের জিনিসটির সৌন্দর্যও আলাদা করে বোঝা যায় না।
এই অন্দরসজ্জাবিদের পরামর্শ, “অনেক ছোট অনুষঙ্গের বদলে আকারে বড় ও দৃষ্টিনন্দন একটি উপকরণ বেছে নেওয়া যেতে পারে।”
তার এই ভাবনার সঙ্গে মিল রেখে বসার ঘরের টেবিলে একটি বড় ফুলদানি, মাটির পাত্র বা নান্দনিক ভাস্কর্য রাখা যায়। ফুলদানিতে ঋতু অনুযায়ী তাজা ফুল রাখলে সাজে আসে নতুনত্ব।
আবার ফুল না থাকলেও সুন্দর আকৃতির পাত্রটি ঘরের সাজে ভিন্নতা যোগ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে রং বাছাইয়ের সময় সাদা, ধূসর, মাটির রং বা ধোঁয়াটে বাদামির মতো কোমল রং বিবেচনা করা যায়।
তবে পুরো ঘরে একই রংয়ের উপকরণ রাখতেই হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। বরং ঘরের দেয়াল, পর্দা ও আসবাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বা দুটি অনুষঙ্গকে আলাদা করে ফুটিয়ে তুললে সাজ আরও পরিপাটি দেখায়।
ঋতুভিত্তিক সাজে নয়, রংয়ে উৎসবের আমেজ
শরৎ, হেমন্ত বা শীতে কৃত্রিম উপকরণ, ঋতুর ছবি আঁকা বালিশ কিংবা উৎসবের বিশেষ লেখা দেওয়া দেয়ালসজ্জা দিয়ে ঘর সাজানোর প্রয়োজন থাকে না। কারণ অতিরিক্ত ব্যবহার ঘরের সাজকে একঘেয়ে করে দিতে পারে।
তাই ঋতুভিত্তিক অতিরিক্ত সাজের পরিবর্তে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় এমন উপকরণ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, এই অন্দরসজ্জাবিদ।
এ ক্ষেত্রে রং, কাপড়ের বুনন ও ছোটখাটো পরিবর্তনের মাধ্যমেই সেই আবহ তৈরি করা সম্ভব। শরৎ, হেমন্ত বা শীতের সময় বসার ঘরে গাঢ় লালচে বাদামি, পোড়া কমলা, জলপাই সবুজ বা মাটির রংয়ের কুশন রাখা যায়।
এ ছাড়া সোফার ওপর নরম চাদর বা বোনা কাপড়ের আসনও ঘরে উষ্ণতা যোগ করবে। বসন্তে একই জায়গায় হালকা সবুজ, ফিকে গোলাপি বা হলুদাভ রংয়ের কাপড় ব্যবহার করলে ঘরকে সতেজ মনে হবে।
অতিরিক্ত গ্রামীণ ধারা নয়, প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য
কাঠের আসবাব, সাদা দেয়াল, গ্রামীণ শৈলীর লেখা, পুরানো দিনের সাজের উপকরণ এবং খামারবাড়ির আদলের আসবাব অন্দরসজ্জায় বিশেষ ভাবে ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু একই ধরনের কাঠের আসবাব, সাদা-বাদামি রংয়ের আধিক্য এবং একাধিক বিষয়ভিত্তিক অনুষঙ্গ ব্যবহার করলে ঘরের সাজে বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে।
এই অন্দরসজ্জাবিদ অতিরিক্ত আধুনিক গ্রামীণ ধারার পরিবর্তে শান্ত ও প্রাকৃতিক উপকরণ নির্ভর সাজের দিকে ঝোঁকার কথা বলেছেন।
এ ধরনের সাজে কাঠ, পাট, সুতি, লিনেন, বেত ও মাটির উপকরণ ব্যবহার করা যায়। তবে সবকিছু একই নকশা বা রংয়ের হতে হবে না। বরং উপকরণের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে সাজানোই এর মূল বিষয়।
কৃত্রিম ফুলের বাহুল্য নয়
কৃত্রিম ফুল, প্লাস্টিকের ফল, নকল লতাপাতা বা একই ধরনের তৈরি সাজের উপকরণ দিয়ে ঘরের প্রতিটি কোণ ভরিয়ে তোলার প্রবণতা ঘরের স্বাভাবিক সৌন্দর্যে ঘাটতি আনে।
বিশেষ করে সব উপকরণ একই রকম উজ্জ্বল ও নিখুঁত হলে সাজে স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের অভাব দেখা দিতে পারে। এর বদলে তাজা ফুল, শুকনো ফুল, পাতার ডাল, প্রাকৃতিক বুননের ঝুড়ি বা কাঠের তৈরি ছোট অনুষঙ্গ দিয়ে ঘরে কোমল আমেজ আনা যায়।
তাজা ফুলের পাশাপাশি শুকনো ফুলও দীর্ঘদিন সাজিয়ে রাখা যায়, তবে ধুলা জমলে পরিষ্কার করতে হবে।
একই ধরনের কাপড় নয়, বুননে বৈচিত্র্য
সোফা, চেয়ার, টুল, কুশন বা শোবার ঘরের আসবাবে একই ধরনের কাপড়ের আধিক্যের বদলে বিভিন্ন বুনন ও উপকরণের সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়াই সহজ সমাধান।
সে ক্ষেত্রে মখমল, লিনেন ও অন্যান্য বোনা কাপড় একসঙ্গে ব্যবহার করলে ঘরের সাজে অনেকটাই গভীরতা ও বৈচিত্র্য আসে।
এই ভাবনা অনুসার করে মসৃণ সোফার সঙ্গে বোনা কুশন, সুতি চাদর বা বেতের আসন ব্যবহার করা যায়। কাঠের আসবাবের পাশে নরম কাপড়ের ছোট টুল রাখলে ঘরে আরামদায়ক অনুভূতি তৈরি হয়।
আবার একাধিক নকশা একসঙ্গে ব্যবহার করলে রংয়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি। একটি কাপড়ের নকশা যদি বেশ জটিল হয়, অন্য উপকরণগুলো তুলনামূলক সরল রাখলে সাজে ভারসাম্য থাকে।
