চট্টগ্রামের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সংখ্যাগুরু বা সংখ্যা লঘিষ্ট কোনো বিষয় নয়। বিষয় একটিই, আপনি বাংলাদেশি।
দুর্গাপূজার নবমীতে মঙ্গলবার রাতে জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী।
রংপুর ও রাজশাহীর দুই মণ্ডপের পূজা দেখে প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে জেএম সেন হল পৌঁছান।
সেখানে তাকে অভ্যর্থনা জানান বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ ব্যানার্জি, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের কার্যকরী সেক্রেটারি বিপ্লব দে পার্থ এবং হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি রাজীব ধর তমাল।
জে এম সেন হলে গত ৪০ বছর ধরে দুর্গা পূজার আয়োজন করে আসছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখা।
পরিষদের নেতারা জানান, এই প্রথম একজন প্রধানমন্ত্রী জে এম সেন হলে দুর্গা পূজা দেখতে এলেন।
সেখানে সরকারপ্রধান বলেন, “সংখ্যাগুরু বা সংখ্যা লঘিষ্ট কোনো বিষয় নয়। বিষয় একটিই, আপনি বাংলাদেশি।
“এই দেশের আইন আমার জন্য যেভাবে প্রযোজ্য, এই দেশের আইন আপনার জন্যও প্রযোজ্য। এই দেশের ওপরে আপনার যে অধিকার আছে, এই দেশের ওপর আমারও এই অধিকার আছে। এই রাষ্ট্র আপনাকে যা দিবে, এই রাষ্ট্র আমাকেও তাই দেবে।”
শারদীয় দুর্গোৎসবের মধ্যে তিন নগরী সফরের অংশ হিসেবে সকালে ঢাকা থেকে রংপুরে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন।
তারপর সামরিক বিমানে করে পৌঁছান রাজশাহীতে। নগরীর হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভায় অংশ নিয়ে পরে তিনি ধর্মসভার পূজামণ্ডপ দেখতে যান।
রাজশাহীর কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তারেক রহমান। সেখান থেকে সরাসরি জে এম সেন হলে পৌঁছান।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন জেলায় তার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কথা বলেন। গত দুই দিনে আরও কয়েকটি জায়গায় যাওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সরকারপ্রধান বলেন, “১৯৭১ সালে এই বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধের মাধ্যমে তারা এই প্রিয় মাতৃভূমিকে ছিনিয়ে এনেছিল। সেদিন যুদ্ধের মাঠে লক্ষ মানুষ যুদ্ধ করেছিল। কয়েক লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে। যারা যুদ্ধ করেছিলেন, যারা শহীদ হয়েছেন।”
তিনি বলেন, “সেদিন কিন্তু আমরা দেখিনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান। আমরা কোন ধর্ম দেখিনি। আমরা শুধু দেখেছি তারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। তারা দেশকে স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন। তারা দেশকে স্বাধীন করেছেন।
“স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। এবং সেই সময়েও ছাত্র জনতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রাজপথে নেমে এসেছিল গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য। জনগণের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। জনগণের কথা বলার অধিকার, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। সেদিনও কিন্তু আমরা দেখিনি আমার পাশের কর্মীটা কোন ধর্মের।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বেশিদিন আগের কথা নয়। দুই থেকে সোয়া দুই বছর আগের কথা। ২০২৪ সালের জুলাই অগাস্টে এই দেশের মানুষ, এই দেশের ছাত্র জনতা এক স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সমগ্র বাংলাদেশে সেদিন রাজপথে বেরিয়ে এসেছিলেন। মা বোনেরা বেরিয়ে এসেছিলেন।
“বিভিন্ন বয়সের মানুষ বেরিয়ে এসেছিলেন। শিশুরা বেরিয়ে এসেছিল। তরুণরা বেরিয়ে এসেছিল। যুবকরা বেরিয়ে এসেছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ তারা রাজপথে, দেশের প্রত্যেকটি জেলায়। স্বৈরাচার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কেউ কিন্তু আমরা জিজ্ঞেস করিনি গুলি খাওয়া মানুষটি মুসলমান নাকি হিন্দু, নাকি বৌদ্ধ, নাকি খ্রিস্টান।”
তারেক রহমান বলেন, “স্বৈরাচার গুলি করেছে। ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে। বাকিরা তাদেরকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে। কেউ জিজ্ঞেস করেনি কি তার ধর্ম পরিচয়। ডাক্তার জিজ্ঞেস করেনি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে যে কি তার ধর্ম পরিচয়, তার ওপরে ভিত্তি করে চিকিৎসা দেবে। এই ঘটনাগুলো হয়নি।”
সমবেতদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “প্রিয় ভাই ও বোনেরা আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এটুকু বলার জন্যে- এই দেশ আপনার, এই দেশ আমার। এই দেশ আমাদের সকলের। আমরা মুসলমান হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ হই, খ্রিস্টান হই, যেই হই না কেন।
“ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকটি মানুষ বাংলাদেশি। যে ধর্মেরই হই না কেন। যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে আমরা বড় হচ্ছি- আমরা এই দেশের নাগরিক। আমাদের একমাত্র পরিচয় ধর্মের পরিচয় না। আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।”
সরকারপ্রধান বলেন, “চিন্তা করে দেখুন। আমি একজন মুসলমান। আমাকে রাজনৈতিক কারণে বাধ্য হয়ে ১৭টি বছর বিদেশে থাকতে হয়েছিল। এখন সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু এই শব্দ দিয়ে কাউকে যাচাই বাছাই করতে হয় তাহলে হয়তো আমি এখানে সংখ্যাগুরু। কিন্তু আমি যখন লন্ডনে ছিলাম আমি কি সংখ্যাগুরু ছিলাম?
“সেই দেশে তো অন্য ধর্মের মানুষ বেশি। আমি তো ওখানে সংখ্যা লঘিষ্ট ছিলাম।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “১৯৭১ সাল থেকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একটিই ছিল। কী সেটি? একটি বাংলাদেশ গড়া যেখানে আমরা সকলে শান্তিতে থাকব। যেখানে আমরা সকলে মিলেমিশে থাকব। এটিই ছিল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য- যারা ১৯৭১ সালে শহীদ হয়েছিলেন, যারা বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন।
“এটিই ছিল জুলাই আগস্টে ছাত্র জনতা যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আসুন না আমরা সকলে মিলে সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলি। যে বাংলাদেশের জন্য দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন সময় অকাতরে আমরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছি।”
সমবেতদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয় আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হন, আপনি মুসলমান হন, আপনি বৌদ্ধ হন, আপনি খ্রিস্টান হন যাই হোন না কেন আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।”
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি বলেন, “কখনো রাষ্ট্র প্রধান এখানে আসেননি। আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। এমন এক সময়ে আজ শারদ উৎসব গত নির্বাচনের পর। ৫ অগাস্টের পর আমরা আতঙ্কিত ছিলাম। বিএনপি নেতৃবৃন্দ পাশে ছিল। তাই চট্টগ্রামে কোথাও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস হয়নি।
“আমরা গত নির্বাচনে প্রমাণ করেছি আমরা কোনো দলের পক্ষে নই। আমরা একাত্তরকে ভালোবাসি। আমরা অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে বসবাস করতে চাই। সনাতন সম্প্রদায় এই দেশকে ভালোবাসি। এদেশে থাকতে চাই।”
কিছু দাবি দাওয়া আছে তুলে ধরে অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি বলেন, “চন্দ্রনাথ ধাম জাতীয়করণ করা হয়নি গত ৫৫ বছরে। যেখান থেকে দুর্গা পূজা শুরু সেই মেধস আশ্রমেরও বেহাল দশা। দুর্গা পূজার ছুটি বাড়ানোয় কৃতজ্ঞতা জানাই। হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশন করে দিন। সবাই একসাথে সম্প্রীতির পরিবেশে মিলেমিশে থাকতে চাই।
“যদি আপনি আমাদের পাশে থাকেন আমরাও আপনার পাশে থাকতে চাই। ৫ অগাস্টের পর চট্টগ্রামে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। সেবক কলোনি ও হাজারি গলির কিছু মানুষ এখনো মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে জেলে আছে। তাদের বিষয়ে সুবিচার চাই। আপনি আমাদের পাশে থাকবেন এই আশা করছি।”
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার।
সেখানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন।
