সিমেন্ট আর কমলালেবুর শহর ছাতক। সুনামগঞ্জের সাথে ছাতক উপজেলা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বিভাগীয় নগরী সিলেটের সাথে ছাতকের মানুষের চলাফেরা লেনদেন যাতায়াত ও ব্যবসা বাণিজ্য রয়েছে।
কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরো
সিমেন্ট আর কমলালেবুর শহর ছাতক। সুনামগঞ্জের সাথে ছাতক উপজেলা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বিভাগীয় নগরী সিলেটের সাথে ছাতকের মানুষের চলাফেরা লেনদেন যাতায়াত ও ব্যবসা বাণিজ্য রয়েছে। ১৫-২০ বছর আগে ছাতকের সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনও করেছিল সিলেটের সাথে সম্পৃক্ততা পাওয়ার জন্য। অবশেষে আইনী জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এককালে সিলেটের সাথে ছাতকের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার একমাত্র মাধ্যম ছিল রেলযোগাযোগ। ছাতক থেকে রেল দিয়ে লক্ষ লক্ষ বস্তা সিমেন্ট যেতো গোটা সিলেট বিভাগে। ট্রেন দিয়ে প্রচুর পরিমাণ মৌসুমী সবজি আসতো ভোরবেলা সিলেটে। কিন্তু এখন বাস ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল শুরু হওয়ায় ট্রেন যেন থমকে দাড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০০৪ সালের ও ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় অনেক কিলোমিটারের পর কিলোমিটার রেললাইন উপড়ে পড়ায় ট্রেন যোগাযোগ রীতিমতো বন্ধ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে কিছু কিছু কাজ হলেও শিল্প শহর ছাতকের মানুষ জানে না কবে চালু হচ্ছে এই রেল যোগাযোগ। আর এজন্য অত্র এলাকার মানুষকে হয়তো অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘদিন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সর্বশেষ স্টেশন সুনামগঞ্জের ছাতক। শিল্পনগর হিসেবে একসময় পরিচিতি ছিল ছাতকের। চুন, চুনাপাথর, পাথর, সিমেন্ট এবং পাল্প এন্ড পেপার মিলের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল অঞ্চলটি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পণ্য পরিবহনের জন্য ১৯৫৪ সালে স্থাপন করা হয়েছিল সিলেট-ছাতক রেললাইনটি। কিন্তু গত ৬ বছর ধরে এই লাইনে হুইসেল বাজেনি কোন ট্রেনের। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেওয়া হলেও মেয়াদ শেষে কাজের অগ্রগতি সিকিভাগ পেরুতে পারেনি। কাজে ধীরগতির কারণে বর্ধিত মেয়াদেও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কিত স্থানীয়রা।
সিলেট রেলওয়ে সূত্র জানায়, করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের মার্চে সিলেট-ছাতক রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সারা দেশে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলেও ছাতক রুটে আর ট্রেন চলেনি। এর মধ্যে ২০২২ সালে ভয়াবহ বন্যায় রেললাইনটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার পর রেললাইন মেরামত নিয়ে শুরু হয় গড়িমসি। পরবর্তীতে অন্তবর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় সংস্কার কাজ। চলতি বছরের ২৩ আগস্ট প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও রেলওয়ের নথির তথ্য অনুযায়ী কাজ হয়েছে মাত্র ২১ ভাগ। আর সিলেট-ছাতকবাজার সেকশন (মিটারগেজ) পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মহিউদ্দিন আরিফের তথ্যমতে এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ২৫ শতাংশ।
সিলেট-ছাতক রুটের ট্রেনে শুধু যাত্রী চলাচল করতেন না। স্থানীয় কৃষি ও শিল্পে এই রেললাইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। ছাতক থেকে ট্রেনে করে একসময় বালু, পাথর, চুনাপাথর, সিমেন্টসহ কৃষিজপণ্য পরিবহন করা হতো। দেশের একমাত্র কংক্রিট স্লিপার কারখানাটিও ছিল ছাতকে। কিন্তু রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা বাড়তি ভাড়ায় এসব পণ্য গাড়ি দিয়ে পরিবহন করতে হচ্ছে। একসময় ছাতকগামী ট্রেন খাজাঞ্চিগাঁও, সৎপুর ও আফজালাবাদ স্টেশনে যাত্রা বিরতি করতো।
সিলেট-ছাতকবাজার ৩৪ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসনে ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের কাজ পায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড (এমএএইচএল)। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ২৩ আগস্ট। এর মধ্যে রেলপথে মাটি ভরাট, কালভার্ট নির্মাণ, সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার ও রেললাইন বসানোর কথা ছিল। মাটি ভরাটের জন্য ইতোমধ্যে পুরনো রেললাইন অপসারণের কাজ শেষ হয়েছে। স্টেশনের পাইলিংয়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। তবে বিভিন্ন স্থানে চলমান সংস্কার কাজে ধীরগতি দেখা গেছে। রেল চলাচল না করায় কোথাও কোথাও রেলপথ হারিয়ে গেছে জঙ্গলে। দেখে বোঝারই উপায় নেই এখানে একসময় রেলপথ ছিল।
এদিকে, রেললাইনটির কাজ সম্পন্ন করতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদে মাত্র ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ায় বর্ধিত মেয়াদেও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে আশার আলো দেখছেন না স্থানীয়রা।
প্রকল্প পরিচালক মো. মহিউদ্দিন আরিফ মেয়াদ বৃদ্ধির তথ্য নিশ্চিত করে জানান, বৃষ্টির কারণে রেলপথে মাটি ভরাটের কাজ শেষ করা যায়নি। যে কারণে নির্ধারিত মেয়াদে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। মাটির কাজ শেষ হলেই রেলপথ বসানোর কাজ শুরু হবে। বর্ধিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
ছাতকপথে রেল যোগাযোগ শুরু হলে সিলেট ও ছাতকের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে ছাতক-সিলেটের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীবৃন্দ। এমনটি আশা করেন সিলেট রেলওয়ে ষ্টেশন ম্যানেজার মোঃ নুরুল ইসলাম।
