দক্ষিণাঞ্চলে সর্ববৃহৎ জনবহুল রূপসাঘাট। প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষের পারাপার। এখানকার অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর কেসিসি পরিচালিত এ ঘাট বিআইডব্লিউটিএ দখল নেয়। পূর্বের টোল দিগুণ করে সাধারণ মানুষদের সীমাহীন দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। এ অভিযোগ নিয়মিত ঘাট পারাপারের সাধারণ যাত্রীদের। পাশাপাশি ট্রলার মাঝিদের অতিরিক্তি পারানি এবং যাত্রী বহনের অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা বিরাজমান থাকলেও কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। ফলে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার যাত্রী সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় যাত্রীদের। এদিকে ঘাট পারাপারের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে স্থানীয় এমপি আজিজুল বারী হেলাল এ ঘাটে ফেরি চালুর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তায়ন হয়নি।
এদিকে খুলনার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান জেলা প্রশাসকের দপ্তরে অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা সভায় রূপসা ঘাটের অনিয়ম রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশনা দিলেও তা কাজে আসেনি। শুধু রেজুলেশনে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ঘাট পারাপারের যাত্রী ও স্থানীয়রা জানায়, বিগত শাসনামলে ঘাটের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল কেসিসি’র। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে দেশের প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার সাথে সাথে এখানকার চিত্রও বদলে যায়। বর্তমানে যাত্রী পারাপারে দ্বিগুণ টাকা নেওয়া হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না ব্যবহৃত কাপড় পরিবহন করা ব্যাগও। দ্বিগুণ টাকা নেওয়া হলেও ঘাটের সেবার মান বাড়েনি বলে অধিকাংশ যাত্রীদের অভিযোগ। ভাঙা গ্যাংওয়ে দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয় তাদের। টোল আদায়ে অনিয়মের পাশাপাশি জন প্রতি ৪ টাকা ট্রলার ভাড়া ৫ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী বহনেরও অভিযোগ রয়েছে। রাত সাড়ে ১০টার পর নেওয়া হয় দ্বিগুণ যাত্রী। সাড়ে ১১টার পর ৫টাকার ভাড়া নেওয়া হয় ১০টাকা।
ঘাটে কথা হয় মোঃ মনিরুল হাসান সুমনের সাথে। পেশায় তিনি রাজমিস্ত্রি। রূপসা উপজেলার নৈহাটি গ্রামের বাসিন্দা।
জীবিকার তাদিগে প্রতিদিন সকালে সাইকেল চালিয়ে তাকে খুলনায় আসতে হয়। বাঁধ সাধে রূপসা ঘাট। আগে সাইকেল বাবদ টোল দু’টাকা গুণলেও এখন দিতে হচ্ছে ৫ টাকা। সাথে আছে নৌকা ভাড়া। প্রতিদিন তাকে ঘাট পরাপার হতে ত্রিশ টাকা গুণতে হয়। মাঝে মধ্যে কোনো পণ্য সাইকেলে করে আনলে তার জন্য গুণতে হয় অতিরিক্ত টাকা।
তিনি বলেন, গত কয়েকদিন আগে রাতে গ্যাংওয়ের ভাঙা অংশে পড়ে গিয়ে বিভিন্নস্থানে ক্ষত হয়।
কথা হয় রূপসা উপজেলার বোলোটি গ্রামের কৌশিক হালদারের সাথে। তিনি উপজেলার একটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বড় বোন খুলনার বাগমারা বসবাস করেন। শুক্রবার বোনের জন্য একটি মুরগী নিয়ে ঘাট পার হচ্ছিলেন। এ সময়ে ঘাটের লোকজন তার কাছে মুরগীর ভাড়া বাবদ ১০ টাকা চায়। রাগ হয়ে তিনি পুনরায় বাড়ি ফিরে যান।
খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনিমেষ বলেন, বাবার জন্য একটি টেবিল ফ্যান নিয়ে কাজদিয়া বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। কিন্তু ফ্যানের টোল বাবদ পঞ্চাশ টাকা আদায় করে ঘাট কর্তৃপক্ষ।
রূপসা উপজেলা বাজারের ব্যবসায়ী তানভীর দোকানের জন্য ছোট একটি শোকেস নিয়ে নদী পার হওয়ার উদ্দেশ্যে ঘাটে আসেন। শোকেস বাবদ তার কাছ থেকে ২০ টাকা নেয় ঘাটে থাকা ইজারাদারদের লোকজন।
এ সময়ে যাত্রীদের ঘাট পারাপার ও মালামাল বহনের একটি চার্ট আসে এ প্রতিবেদকের হাতে। সেখানে প্রতি ১০০ কেজি বা অংশ বিশেষ ধার্য করা হয়েছে ১০ টাকা। একইভাবে হাঁস মুরগী বহনকারী প্রতি ঝুড়ি ধার্য করা হয়েছে ১০ টাকা। তবে ১০টি পর্যন্ত হাঁস, মুরগী ফ্রি বলে উল্লেখ রয়েছে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা গুরু, মহিষসহ অন্যান্য গবাদিপশু বহনের ক্ষেত্রে টোল ধার্য করা হয়েছে ১০ টাকা থেকে ৩০ টাকা, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও বাইসাইকেল ১০ টাকা ধার্য করা হয়েছে।
কাপড়ের খালি ব্যাগ বহন করা বাবদ ২০ টাকা নেওয়ার কথা জিজ্ঞাসা করা হলে সেখানে থাকা ইজারাদারের কর্মচারী কুদ্দুস কোনো উত্তর দিতে পারেন নি। তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে এ প্রতিবেদকের সাথে উত্তোজিত হয়ে কথা বলেন।
মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ (উপ-পরিচালক, খুলনা নদী বন্দর) বলেন, এ অনিয়মের কারণে আমাদের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পরিচালক রহমতুল্লাহ দু’একদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিবেন। এ খবর আমার প্রতিদিনই পাচ্ছি। মাঝে মধ্যে অফিসের স্টাফদের ঘাটের টোল ঘরে বসিয়ে রাখা হয়। তখন ইজারাদার এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে। খুলনার কয়েকটি ঘাট নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। সেই মামলার একটি রূপসা ঘাট। কীভাবে ইজারা দিলেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন সব কাগজ আপনার হোয়াইটস এ্যাপে পাঠিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু তিনি তা পাঠাননি।
তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক ঘাটটি পরিচালনা করা হচ্ছে। নদী পারাপারের টাকা মাঝিরা নেয়। ঘাটে প্রবেশ ফি দু’টাকা নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ইজারাদারের এহেন কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তারা আমাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করে। পরবর্তীতে আইন উপদেষ্টার মতামতের ভিত্তিতে আমরা প্রক্রিয়া থেকে সরে আসি।
খুলনা গেজেট/এএজে
