সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে জনসাধারণকে সতর্ক করতে কোনো বার্তা দেয়নি দেশটির সরকার। রাতে সতর্কবার্তা পেয়ে মানুষের ঘুম নষ্ট হওয়া এবং এ নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগের কারণে আগাম সতর্কতা বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
গত সপ্তাহে রিয়াদের বিমানবন্দরে চার দফা হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। অথচ হামলার আগে জনসাধারণের জন্য কোনো সতর্কবার্তা জারি করা হয়নি। কেন সতর্কব্যবস্থা নীরব ছিল, সে বিষয়ে সৌদি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব গত মে মাসে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করে। তবে হুথিদের হামলার ঝুঁকি বাড়লেও গত সপ্তাহের হামলার আগে ব্যবস্থাটি নীরব ছিল। সর্বশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশে।
হামলার আগে সৌদি আরবের মিত্র একটি পশ্চিমা দেশের কর্মকর্তারা দেশটির কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন আগাম সতর্কবার্তা বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি অবগত দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাব ছিল— সতর্কবার্তাগুলো জনজীবনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল। বিশেষ করে রাতে সতর্কবার্তায় ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অনেক নাগরিক অভিযোগ করেছিলেন।
তবে এ বিষয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথিদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত। এ সময় দেশটি নিজেদের স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিমানবন্দরে হামলার আগে সতর্কবার্তা না দেওয়ায় দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নাগরিক ও বিদেশি দর্শনার্থীদের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, হামলার বিষয়ে জনসাধারণকে কীভাবে জানানো হবে, তা নিয়ে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে রিয়াদ। তবে সতর্কবার্তা না দেওয়ায় হামলা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, হুথিদের হামলার জবাব দিতে চায় সৌদি আরব, কিন্তু এর কারণে দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হোক, তা চায় না। অথচ আগাম সতর্কবার্তা না দেওয়ায় যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে, সরকার সেটিই এড়াতে চাইছিল।
অন্যদিকে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। তবে হামলার আগে জনসাধারণকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে দেশগুলোর পদ্ধতি ভিন্ন।
কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতিটি হামলার আগে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা দিয়েছে। বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকতে এবং জানালা থেকে দূরে থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বাহরাইন ও কুয়েতেও বারবার সাইরেন বাজিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এইদিকে, সৌদি আরবে জনসাধারণের জন্য সতর্কবার্তা বন্ধ থাকলেও দেশটিতে অবস্থিত পশ্চিমা দূতাবাসগুলো নিজেদের কর্মীদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সতর্কতা জারি করছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর গোয়েন্দা তথ্য এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব সতর্কবার্তা দেওয়া হতো বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
তবে গত শনিবারের বিমানবন্দর হামলার আগে দূতাবাসগুলোও কোনো অভ্যন্তরীণ সতর্কতা পায়নি। গত সপ্তাহের হামলাগুলোর মধ্যে শনিবারের হামলাটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। সোমবার সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ রিয়াদসহ দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি শহরে সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে আবারও সতর্কবার্তা জারি করে। তবে বিমানবন্দরে হামলার পরই সতর্কবার্তা দেওয়ার কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স।