রংপুরের পীরগাছায় চাঁদাবাজির মামলায় আটজনকে কারাগারে পাঠানোর পর উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন আসামি ও তাদের স্বজনেরা। তাদের দাবি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় পরিকল্পিতভাবে তাদের মামলায় জড়ানো হয়েছে।
গত মঙ্গলবার রংপুরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩-এর বিচারক আশিক মাহমুদের আদালতে হাজিরা দিতে গেলে একটি মামলায় জামিন বাতিল করে আটজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সময় প্রিজন ভ্যান থেকে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা, তার ভাই রেজা চেয়ারম্যান, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কয়েকজন আসামি।
বিজ্ঞাপন
কারাগারে নেওয়ার পথে রাকিবুল ইসলাম রকি অভিযোগ করেন, পীরগাছা উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলমের ভাই ইয়াবা ব্যবসায়ী, তার চাচা চোর এবং তিনি নিজে ধান্ধাবাজ ও চাঁদাবাজ। তাদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় আসামিদের মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
দেউতি আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, তিনি ও ইউপি সদস্য আব্দুর রাজ্জাক কোনো চাঁদা দাবি করেননি। অথচ তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করা হয়েছে। তার অভিযোগ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা, তার ভাই রেজা চেয়ারম্যান, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম এবং পারুল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন পরিকল্পিতভাবে তাদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করছেন।
পারুল ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য মোশাররফ হোসেনও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি রাঙ্গা, সহসভাপতি রেজা, যুবদলের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে বলেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দাবি করেন তিনি।
মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর রংপুর জেলা বিএনপির তৎকালীন সদস্যসচিব প্রয়াত আনিছুর রহমান লাকুর স্মরণসভায় গেলে পারুল ইউনিয়ন বিএনপি নেতা রাশেদুল ইসলাম রাশেদের ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পীরগাছা থানা-পুলিশ মামলা না নেওয়ায় ১৭ অক্টোবর স্থানীয় লোকজন দেউতি বাজারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সাজু, জালাল, আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজনের দাবি, বিক্ষোভ চলাকালে পীরগাছার ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান রেজার গাড়ি যানজটে আটকে পড়ে। আন্দোলনকারীরা গাড়িটি পার করে দেওয়ার চেষ্টা করলে গাড়িতে থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মিজান মিয়ার জুলাই আন্দোলন নিয়ে অশ্লীল মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বলে তাদের দাবি।
পরে শ্রমিক দলের আহ্বায়ক এনামুল হকের নেতৃত্বে কয়েকজন গাড়িটি রাশেদের বাড়ির সড়কের দিকে নিয়ে যান। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা গাড়ির কাচ ভাঙচুর করে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, স্থানীয় লোকজন, সাংবাদিক ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে রেজা চেয়ারম্যানের মালামাল তার হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় ধারণ করা একটি ভিডিওতে মালামাল বুঝে পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং রাশেদকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বলে মন্তব্য করেন মামলার বাদী মোস্তাফিজার রহমান রেজা। ভিডিওটি প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
এজাহারে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর আসামিরা বাদীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, পরে ১৭ অক্টোবর দেউতি বাজারের কাছে বাদীর গাড়ির গতিরোধ করা হয়। এ সময় লোহার রড ও লাঠি দিয়ে গাড়ির কাচ ভাঙচুর, বাদী ও তার চালককে মারধর এবং গাড়িতে থাকা একটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। ওই ব্যাগে ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এ ঘটনায় বাদী অজ্ঞাতপরিচয় চার থেকে পাঁচজনসহ মোট নয়জনের নাম উল্লেখ করে পীরগাছা থানায় মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ১৪।
মামলায় কারাগারে পাঠানো আটজনের মধ্যে রয়েছেন পশু চিকিৎসক মো. রহমত (২৫), মো. রাকিবুল ইসলাম রকি (২৫), ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য ও দেউতি আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম (৩৫), পারুল ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুর রাজ্জাক (৪৫), পারুল ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য মোশাররফ হোসেন (৩৪), আব্দুস সালাম (২৮), পারুল ইউনিয়ন ছাত্রদলের সিনিয়র সভাপতি মো. রানা মিয়া (২৮) এবং অটোরিকশাচালক দুলু মিয়া (৪০)।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আলাউদ্দিন আলমগীর বলেন, মামলার এজাহারে উল্লেখিত অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে ভিত্তিহীন হওয়ায় আসামিরা শুরু থেকেই জামিনে ছিলেন। ১৩ অক্টোবর আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচারের জন্য আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’
কারাগারে যাওয়া আসামি ও তাদের স্বজনেরা মামলাটিকে হয়রানিমূলক দাবি করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, মামলার এজাহারে বাদী চাঁদা দাবি, হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে মামলার বাদী মোস্তাফিজার রহমান রেজা বলেন, ‘আমি মামলা করেছি, আদালত যে রায় দেবে, আমি সেটা মেনে নেব।’
