ইলেকট্রিক স্পোর্টস গাড়ির জন্য অগ্রিম অর্থ নেওয়া শুরুর প্রায় এক দশক পর অবশেষে নিজেদের বহুল আলোচিত নতুন প্রজন্মের রোডস্টার উন্মোচন করেছে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাতা মার্কিন কোম্পানি টেসলা।
সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ওয়েকোর কাছে অবস্থিত স্পেসএক্স টেস্ট সাইট থেকে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে।
অনুষ্ঠানে টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন কোম্পানিটির নকশা প্রধান ফ্রাঞ্জ ভন হোলজহাউসেন ও ভেহিকল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট লার্স মোরাভি।
উন্মোচন মঞ্চে ইলন মাস্ক বেশ রোমাঞ্চ প্রকাশ করে বলেছেন, “আজ রাতে আপনারা একদম পাগলাটে কিছু দেখতে যাচ্ছেন। বিশ্বের সেরা গাড়ি নির্মাতা ও রকেট কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে কী ঘটে আজ রাতে আপনারা তারই ফলাফল দেখতে পাবেন।”
টেসলার মূল ‘রোডস্টার’ গাড়িটির ইতিহাস বেশ পুরনো। প্রতিষ্ঠাতা সিইও মার্টিন এবারহার্ডের নেতৃত্বাধীন একটি দল এর নকশা ও কারিগরি রূপ দিয়েছিল।
‘লোটাস এলিস’ গাড়ির শ্যাসির ওপর ভিত্তি করে তৈরি ওই গাড়িটি ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রায় ১ লাখ ডলারের সেই মডেলটি ২০১২ সাল পর্যন্ত অল্প সংখ্যায় বিক্রি হয়েছিল।
এবারের নতুন প্রজন্মের ‘রোডস্টার’ গাড়িটিকে অটোমোবাইল প্রযুক্তির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা উচ্চমানের কিন্তু সীমিত সংস্করণের মডেল হতে যাচ্ছে। এতে যুক্ত করা হয়েছে স্পেসএক্সের রকেট প্রযুক্তি, যা গাড়িটিকে বাতাসে ভেসে থাকতে বা ‘হোভার’ করতে সাহায্য করবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাস্ক-অনুরাগীরা এ গাড়ি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, টেসলার মূল ব্যবসায়িক আয়ে বা আর্থিক চিত্রে এই রোডস্টার খুব বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
উন্মোচনী অনুষ্ঠানে মাস্ক ও তার দল গাড়িটি নিয়ে আকর্ষণীয় প্রদর্শনী তুলে ধরেছেন, যেখানে একটি সাদা রঙের স্পোর্টস কার দ্রুত গতিতে একটি বাঁকানো র্যাম্প বেয়ে ওপরে উঠে যায় ও উল্টো হয়ে আটকে থাকে।
এরপরই গাড়িটি শূন্যে লাফিয়ে উঠে মাঝ আকাশে ফ্লিপ করে ও ধীরে ধীরে ভেসে অবশেষে নিরাপদে মাটিতে অবতরণ করে।
টেসলা বলেছে, দুই আসনওয়ালা গাড়িটি কেবল এক সেকেন্ডের কম সময়ে শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬০ মাইল গতি পেতে পারে। দর্শকদের সামনে এ বিস্ময়কর পারফরম্যান্স নিজে চালিয়ে দেখান কোম্পানির ভেহিকল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট লার্স মোরাভি।
বাণিজ্যিক উৎপাদনের বিষয়ে মাস্ক বলেছেন, নতুন প্রজন্মের এ রোডস্টার ২০২৮ সালে উৎপাদনে যাবে। তবে গাড়িটির আনুমানিক দাম কত হবে সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি।
নতুন রোডস্টারের অন্য কোনো ভ্যারিয়েন্টের পারফরম্যান্স বা কারিগরি বৈশিষ্ট্য নিয়েও বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি টেসলা। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে টেসলা তাদের এই রিফ্রেশড রোডস্টারের আগাম বুকিং কার্যক্রম পুনরায় চালু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও চীনের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছ থেকে এর জন্য ৫০ হাজার ডলার করে অগ্রিম নেওয়া হচ্ছে। নতুন রোডস্টারের এই ধারণার কথা ইলন মাস্ক প্রথম প্রচার করেছিলেন ২০১৭ সালের নভেম্বরে এক অনুষ্ঠানে।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জুনে ধারাবাহিক কিছু বার্তা প্রকাশ করে তিনি লিখেছিলেন, “নতুন টেসলা রোডস্টারের ‘স্পেসএক্স অপশন প্যাকেজে’ গাড়ির চারপাশে নিরবচ্ছিন্নভাবে সাজানো প্রায় ১০টি ছোট রকেট থ্রাস্টার থাকবে।”
এসব থ্রাস্টার বা ইঞ্জিনগুলো গাড়ির গতি ও ব্রেকিং সিস্টেমকে অভূতপূর্ব মাত্রায় উন্নত করবে, যা ‘একটি টেসলাকে ওড়ার সক্ষমতাও দিতে পারে’।
টেসলার এ পরীক্ষামূলক গাড়িটি যথাসম্ভব হালকা ওজনের করে তৈরি করা হয়েছে। এতে রয়েছে ‘স্টিয়ার-বাই-ওয়্যার’ সিস্টেম, স্টিয়ারিং ইয়োক ও স্পেসএক্সের তৈরি একগুচ্ছ আধুনিক প্রযুক্তি।
এর মধ্যে রয়েছে রকেট থ্রাস্টার, কার্বন ওভারলে প্রেশার ভেসেল, ডিফিউজার ও শক্তিশালী ফ্যান, যা গাড়িটিকে শূন্যে বিভিন্ন কসরত দেখাতে সাহায্য করবে।
টেসলা তাদের আসন্ন রোডস্টারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিচারের ঘাটতি রেখেছে, সেটা হচ্ছে কোম্পানিটির স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভ ব্যবস্থা বা ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ প্রযুক্তি। মাস্ক বলেছেন, নতুন রোডস্টারই হবে মানুষের হাতে চালানোর জন্য বানানো টেসলার শেষ গাড়ি।
নতুন করে নকশা করা এ রোডস্টারের জন্য টেসলা ২০১৭ সাল থেকেই ৫০ হাজার ডলার করে অগ্রিম নিতে শুরু করেছিল। তবে এরপর থেকে গাড়িটি সরবরাহের প্রতিটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বারবার মিস করেছে কোম্পানিটি।
গেল বছরের অক্টোবরেও মাস্ক নতুন একটি রোডস্টার ডেমো আয়োজনের আশ্বাস দিয়েছিলেন, যা ২০২৫ সাল শেষ হওয়ার আগেই আসার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত সেটাও বাস্তবায়িত হয়নি।
গাড়িটি বাজারে আনতে দেরি হওয়ায় গেল বছর সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ টেসলা প্রধানকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছিলেন মাস্কের সাবেক বন্ধু ও ওপেনএআইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যান।
ওই পোস্টে নিজের বুকিং ও অর্থ ফেরতের আবেদনের স্ক্রিনশটও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
পোস্টে অল্টম্যান লিখেছিলেন, “গাড়িটি নিয়ে আমি সত্যিই খুব উত্তেজিত ছিলাম! বিলম্ব হতেই পারে, সেটা আমি বুঝি। তবে সাড়ে সাত বছর অপেক্ষা করাটা বাড়াবাড়ি বলে মনে হচ্ছে।”
অল্টম্যান অবশ্য পরে তার জামানতের অর্থ ফেরত পেয়েছেন। এর পর ওপেনএআইয়ের পরিচালনা পর্ষদ ও মালিকানা কাঠামোসংক্রান্ত এক আলাদা বিরোধকে কেন্দ্র করে এ বছরের শুরুতে আদালত পর্যন্ত গড়ায় তাদের দ্বন্দ।
তবে অল্টম্যানের মতো সবাই আশা ছেড়ে দেননি। অনেকেই তাদের বুকিং বহাল রেখেছেন।
এদিকে, বুধবার শেয়ারবাজারের লেনদেন শেষে নিজেদের এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা রয়েছে টেসলার।
