সাত মামলায় ৬৮ জনের দণ্ড, অধরা ৪৫
জালালাবাদ ডেস্ক: জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে রায় এসেছে সাতটি মামলায়। দণ্ডিত হয়েছেন ৬৮ জন, তাঁদের মধ্যে ২৩ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। কিন্তু বিচার শেষে দণ্ড কার্যকরের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আসামিদের পলাতক থাকা। দণ্ডিতদের ৪৫ জনই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৩ জনের মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন মাত্র চারজন। ফলে বিচার এগোলেও ন্যায়বিচারের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পুনর্গঠনের পর দুই বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালে ৭০টি মামলার কার্যক্রম চলছে। এসব মামলায় আসামি ৫৫৮ জন। এর মধ্যে ২৬টি মামলায় বিচার চলছে, বাকি ৪৪টি রয়েছে তদন্তসহ বিচার শুরুর আগের বিভিন্ন পর্যায়ে। তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন পেয়েছে প্রায় ৭০০টি অভিযোগ।
সাত মামলায় দণ্ড ৬৮ জনের:
ট্রাইব্যুনালের দুই বেঞ্চে এ পর্যন্ত সাতটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ২৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পেয়েছেন আরও ৪৫ জন।
তবে দণ্ডিতদের বড় অংশই পলাতক থাকায় সাজা কার্যকরের বিষয়টি অনিশ্চিত। প্রসিকিউশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিচারাধীন ও তদন্তাধীন মামলাগুলো মিলিয়ে আসামিদের প্রায় ৬৩ শতাংশ পলাতক। একই ব্যক্তি একাধিক মামলায় আসামি থাকায় বিভিন্ন হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও পুলিশ কর্মকর্তা:
পলাতক আসামিদের তালিকায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এম খুরশিদ হোসেনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা রয়েছেন।
গুমের অভিযোগে করা দুটি মামলায় ৩০ আসামির মধ্যে ১৭ জন পলাতক। নারায়ণগঞ্জে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির সবাই পলাতক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কুষ্টিয়ার একটি মামলায় মাহবুবউল আলম হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে রায় অপেক্ষমাণ; তাঁরাও পলাতক।
রায়ের পর দায়িত্ব সরকারের:
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বিচার চলাকালে আসামি গ্রেফতারের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থারও থাকে। তবে রায় ঘোষণার পর আসামিদের গ্রেফতার ও সাজা কার্যকরের দায়িত্ব সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বর্তায়।
প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম বলেন, আসামি গ্রেফতার না হলে রায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। অনেক আসামি দেশে নাকি বিদেশে, তা নিশ্চিত করাও কঠিন। কেউ কেউ একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশের বাইরে চলে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি শাহাদাত হোসাইন বলেন, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তাঁদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
তবে দুই বছরে পলাতকদের গ্রেফতারে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, বিদেশে অবস্থানরতদের ফিরিয়ে আনতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো সামনে আসেনি।
বিচারপ্রক্রিয়ার লক্ষ্য শুধু রায় ঘোষণা নয়, দণ্ডিতদের আইনের আওতায় এনে আইনানুগভাবে সাজা কার্যকর করাও এর অংশ। স্বজনহারা পরিবার ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের কাছে রায় ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। পলাতকদের গ্রেফতারে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে সেই প্রত্যাশা পূরণ অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
