ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি প্রশাসন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা কর্মসূচি ঘিরে শনিবার, ১০ অক্টোবর, দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধরপাকড় চালায় পুলিশ। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৪১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয় এবং প্রায় ৭ হাজার মানুষকে আটক করা হয়। বিক্ষোভের প্রধান তিন নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটকের পর রবিবার তারা মুক্তি পান। তবে মুক্তির পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অভিজিৎ দীপকে।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে, যা ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগ করতে হবে। তবে ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপির অবস্থানও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দিল্লিতে বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়া, বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড, মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ এবং ব্যাপক আটকের ঘটনা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের খবরও সামনে এসেছে। ফলে বিরোধের কেন্দ্র এখন শুধু নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নয়, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে প্রশাসনের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমাও।
মুচলেকা না দেওয়ার দাবি, ফের আন্দোলনের ঘোষণা: মুক্তির পর অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে আন্দোলন বা রাজপথে বিক্ষোভ না করার শর্তে তিনি কোনো আইনি বন্ড বা মুচলেকায় স্বাক্ষর করেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের কাছে প্রতিবাদ থেকে বিরত থাকার কোনো লিখিত প্রতিশ্রুতি দেননি তিনি। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এই নেতা।
সিজেপির তিন নেতাকে দিল্লিতে বিমান অবতরণের পর আটক করা হয়েছিল। তাদের আটকের ঘটনায় আন্দোলনকারীরা প্রশ্ন তোলেন, কোনো কর্মসূচি ঘিরে আইনশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকলেও তা মোকাবিলার নামে নেতাদের এভাবে আটক করা কতটা যুক্তিসংগত। পরে আদালতের নির্দেশে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। তবে মুক্তির শর্ত নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকারের কথা এসেছে। অভিজিৎ দীপকের দাবি, তিনি কোনো মুচলেকায় স্বাক্ষর করেননি। আদালতের আদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
নিরাপত্তার বলয়ে রাজধানী: শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে পুলিশি বাধা ও ব্যারিকেড বসানো হয়। হিন্দুস্তান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪১ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি প্রায় ৭ হাজার মানুষকে আটক করা হয়। অন্য কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও ব্যাপক ধরপাকড় এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধের কথা জানিয়েছে। মেট্রোর একাধিক স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতও ব্যাহত হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল তাদের সমাবেশস্থলে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া।
অন্যদিকে, পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি না থাকা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কাকে বিধিনিষেধের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সামনে দুটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো কর্মসূচির অনুমতি না থাকলেই কি নির্বিচারে আটক বা ব্যাপক চলাচল-নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যুক্তিসংগত হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আদালতের নির্দেশ এবং সংশ্লিষ্ট নথির ওপর।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশন: ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সিজেপির অভিযোগ, সংশোধনের ফলে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং এতে ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণও দিতে হবে। তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রতিটি ঘটনা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। মৃত ভোটার, স্থানান্তর, দ্বৈত নিবন্ধন কিংবা তথ্যগত ভুলের মতো কারণেও তালিকা সংশোধন প্রয়োজন হতে পারে।
একই সঙ্গে প্রকৃত ভোটারের নাম ভুলভাবে বাদ পড়লে তার ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই বিতর্কের গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তির জন্য বাদ পড়া নামের সংখ্যা, সংশোধনের কারণ, আপিলের সুযোগ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের জবাব রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন। সংশোধিত তালিকার তথ্য যাচাই, ভুল সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা এবং অভিযোগের স্বচ্ছ নিষ্পত্তিই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিআলো/অর্নব